জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (৩১ মে) : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে আর কোনোভাবেই অপরাধী বা সন্ত্রাসী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ রবিবার (৩১ মে) জঙ্গল সলিমপুর অঞ্চলটি সশরীরে পরিদর্শনের পর আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কঠোর বার্তা দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা অপরাধী চক্র এখানে আর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। অপরাধ দমনে প্রশাসন শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধমুক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। কোনো ধরনের অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ এই পরিদর্শনে মন্ত্রীর সঙ্গে দেশ ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ হলেন- ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি বা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের ‘‘দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র’’ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল, যার একটি প্রত্যক্ষ নমুনা হচ্ছে এই জঙ্গল সলিমপুর।’
তিনি জানান, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই চট্টগ্রামে কিছু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে, কিছু ব্যবসায়ীর বাসভবনে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলি বর্ষণ এবং চাঁদা আদায়ের মতো আশঙ্কাজনক ঘটনা ঘটার পর সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধীদের অবদমন করতে গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সন্ত্রাসীদের সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন নিজস্ব পাহারা বসিয়ে সন্ত্রাসীরা যে সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তা যৌথ অভিযানের মাধ্যমে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের কারণে অভিযানের মূল লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার মতো সন্ত্রাসী দুঃসাহসের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা কীভাবে এই দুঃসাহস পেল- তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পেছনে থাকা মূল ভূমিদস্যু ও ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।’
জঙ্গল সলিমপুরের স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জনগণের সরকার। জনগণকে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের মূল লক্ষ্য। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে যারা এখানে এসে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছেন বা স্থানান্তরিত হয়েছেন, তাঁদের কাউকেই আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না।’
তিনি স্পষ্ট করে জানান, এখানকার প্রকৃত বাসিন্দাদের টেকসই পুনর্বাসনের জন্য সরকার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। উচ্ছেদ সংক্রান্ত কোনো ধরনের অপপ্রচারে কান না দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জঙ্গল সলিমপুরকে মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, জঙ্গল সলিমপুরে রোড নেটওয়ার্ক তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। সলিমপুর ইউনিয়নের সঙ্গে সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ ঘটিয়ে একটি আধুনিক রোড নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে ড্রোন চিত্র ও সড়ক মানচিত্র পর্যালোচনা করে এই অঞ্চলে পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেনানিবাসের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির কাজ চলছে। এছাড়া, বায়েজিদ লিংকের আশেপাশে খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের ঝুলে থাকা প্রকল্পটি প্রশাসনিক অনুমোদনের আলোকে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরের পাশাপাশি চট্টগ্রামের অপরাধপ্রবণ বেতুয়া ও চা বাগান এলাকা থেকেও সন্ত্রাসীদের চিরতরে নির্মূল করা হবে বলে মন্ত্রী প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সর্বশেষে, জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশে শতভাগ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
মনোয়ারুল হক/
