জার্মানিতে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি: গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২ মে) : ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপদস্থ’ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। তাৎক্ষণিক এর প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জার্মানিতে সেনার সংখ্যা কমানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ওই মন্তব্যের কয়েকদিন পর আজ শনিবার জার্মানি থেকে ৫ হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এখন প্রশ্ন হলো- জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি কেন রয়েছে, সেগুলো কী ভূমিকা পালন করে। সামরিক ঘাঁটিগুলো গুটিয়ে ফেলার ট্রাম্পের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে?

কেন জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে জার্মানিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সূচনা হয়। নাৎসি শাসনের আত্মসমর্পণের সময় দেশটিতে ১৬ লাখ মার্কিন সৈন্য ছিল। যা এক বছরের মধ্যেই কমে তিন লাখে নেমে আনা হয়। মূলত মার্কিন দখলদারিত্বের অঞ্চলটি পরিচালনা করা হতো।

শীতল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এরপর নাৎসি-মুক্তিকরণের লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে জার্মানিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধক প্রাচীর হিসেবে পুনর্গঠনের দিকে মোড় নেয়। ১৯৪৯ সালে ন্যাটো ও পশ্চিম জার্মানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মার্কিন ঘাঁটিগুলো স্থায়ী রূপ লাভ করে।

শীতল যুদ্ধ চরম পর্যায়ে থাকাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানিতে প্রায় ৫০টি প্রধান ঘাঁটি এবং ৮০০টিরও বেশি স্থাপনা পরিচালনা করত। এর মধ্যে বিশাল বিমানঘাঁটি ও ব্যারাক থেকে শুরু করে গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং তার দুই বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে সামরিক ঘাঁটির মধ্যে অনেকগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৬০ সাল থেকে ৮০-এর দশকে জার্মানিতে মার্কিন সৈন্য সংখ্যা প্রায়ই আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যেত। তাদের পরিবারের আরও কয়েক লাখ সদস্য ঘাঁটিগুলোর ভেতরে ও আশেপাশে বসবাস করতেন। যেখানে স্কুল, দোকান ও সিনেমা হলসহ আমেরিকান শহরের মতো হয়ে উঠেছিল।

সামরিক ঘাঁটিগুলো কত বড়, কী কাজ করে

মার্কিন প্রতিরক্ষা জনশক্তি তথ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউরোপে অবস্থিত বৈদেশিক ঘাঁটিগুলোতে ৬৮ হাজার সেনা সদস্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন ছিলেন। যাদের অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ, প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ জন জার্মানিতে মোতায়েন ছিলেন।

পুরো ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ থেকে ৪০টি ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটির মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় কমান্ড ও আফ্রিকা কমান্ডের স্টুটগার্ট সদর দপ্তর, যা এই দুই মহাদেশে সব মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম সমন্বয় করে।

ইউরোপে অবস্থিত সাতটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির মধ্যে পাঁচটিই জার্মানিতে। বাকি দুটি বেলজিয়াম ও ইতালিতে। স্টুটগার্ট ছাড়াও বৃহত্তম মার্কিন স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশাল রামস্টাইন বিমানঘাঁটি, যা ইউরোপে মার্কিন বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর, যেখানে ৮ হাজার ৫০০ বিমানসেনা সদস্য কর্মরত রয়েছেন।

বাভারিয়া গ্যারিসন দ্বারা পরিচালিত গ্রাফেনভোর, ভিলসেক ও হোহেনফেলস ইউরোপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বৃহত্তম প্রশিক্ষণ এলাকার অংশ। অন্যদিকে, ভিসবাডেন গ্যারিসন হলো মার্কিন সেনাবাহিনী ইউরোপ ও আফ্রিকার সদর দপ্তর। ল্যান্ডস্টুল মেডিকেল সেন্টার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বৃহত্তম মার্কিন সামরিক হাসপাতাল।

শীতল যুদ্ধের পর থেকে ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা আমূল বদলে গেছে। এগুলো মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এবং রসদ সরবরাহের কেন্দ্রে পরিণত হয়। যা ইরাক, আফগানিস্তান ও অতি সম্প্রতি ইরানসহ বিভিন্ন মার্কিন যুদ্ধ শুরু ও সহায়তা করেছে।

সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার হুমকি কী ট্রাম্প আগেও দিয়েছেন

জার্মানি থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার হুমকি ট্রাম্প আগেও একাধিকবার দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে হোয়াইট হাউসে তার প্রথম মেয়াদে জার্মানির স্বল্প প্রতিরক্ষা ব্যয় ও নর্ড স্ট্রিম-২ গ্যাস পাইপলাইনের প্রতি সমর্থনে দৃশ্যত ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি জার্মানিকে ‘দায়িত্বে অবহেলাকারী’ আখ্যা দেন। হুমকি দিয়ে বলেন, সেখানে মার্কিন সৈন্য সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনবেন।

তবে ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো বিস্তারিত তথ্যই দেওয়া হয়নি। এতে পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট, এমনকি বার্লিনে তাদের সমকক্ষ ও ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পুরোপুরি হতবাক হয়ে যান। জানা গেছে, এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কাউকেই জানানো হয়নি।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা ছিল কিছু সৈন্যকে দেশে ফেরত পাঠানো। অন্যদের পোল্যান্ড ও ইতালির মতো দেশে মোতায়েন করা। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কংগ্রেসে বিরোধীদের বাধার সম্মুখীন হয়, প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি স্থগিত করেন ও পরে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাতিল করে দেন।

সৈন্য প্রত্যাহারের খরচ কেমন হবে যুক্তরাষ্ট্রের

জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পথে বাধাগুলো এখনও রয়ে গেছে। ইউরোপীয় কমিশনের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র অনিতা হিপার গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় একটি অপরিহার্য অংশীদার হলেও এখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন তার বৈশ্বিক ভূমিকার সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেও বটে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির আমেরিকান-জার্মান ইনস্টিটিউটের জেফ রাথকে একই কথা বলেছেন, রামস্টাইনের মতো ঘাঁটিগুলো থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। যা না থাকলে তাদের অনেক অভিযানই সফল হতো না; ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হতো।

তিনি আরও বলেন, ইউরোপে মার্কিন বাহিনী ইউরোপীয়দের জন্য কোনো দাতব্য অনুদান নয়; এগুলো আমেরিকার বিশ্বব্যাপী সামরিক প্রভাবের একটি হাতিয়ার। জেফ রাথ বলেন, সংক্ষেপে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে রক্ষা করতে সাহায্য করে; ইউরোপ আমেরিকার বিশ্বব্যাপী সামরিক অভিযানের জন্য অবকাঠামো সরবরাহ করে।

নীতিগতভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইউরোপে সৈন্য পুনর্বিন্যাস করতে পারে। বর্তমানে ইতালিতে প্রায় ১৩ হাজার, যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ও স্পেনে ৪ হাজার সৈন্য রয়েছে। তবে, ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইন অনুসারে, তারা এই সংখ্যা স্থায়ীভাবে ৭৫ হাজারের নিচে নামতে দিতে পারবে না।

কিন্তু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, স্টুটগার্ট ও রামস্টাইনের মতো ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর বিশাল প্রভাব পড়বে। এই ঘাঁটিগুলো কয়েক দশক ধরে পেন্টাগনের কার্যক্রমের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ