যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নৃশংস খুনের শিকার: তদন্ত প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৮ এপ্রিল) : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নৃশংস খুনের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহরকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছেন দেশটির আদালত।

তবে কেন লিমন ও বৃষ্টিকে খুন করা হয়েছে সে বিষয়ে এখনো কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।

লিমন ও বৃষ্টি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) শিক্ষার্থী ছিলেন। ফ্লোরিডার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাম্পা বে টোয়েন্টিএইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যার পর কীভাবে লিমনের লাশ পলিথিনের ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ফেলে আসা হয়েছে তার বিবরণ উঠে এসেছে আদালতের নথিতে।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্য ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, হিশাম আবুগারবিয়েহ ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন ক্লিনিং সরঞ্জাম দিয়ে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করেন এবং আগে থেকে কিনে রাখা বড় কালো আবর্জনা ফেলার পলি ব্যাগে লিমনের মরদেহ ভরে ফেলেন। পরে মরদেহটি ব্রিজের উত্তর পাশে ফেলে আসা হয়।

বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চলাকালে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে। তবে তা বৃষ্টির কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনার অফিস মরদেহটি শনাক্তের কাজ করছে।

এ জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার লিমনের রুমমেট ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির পরিকল্পিত খুনের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

তদন্তকারীদের দাবি, তার বাসার ভেতরেই দুজনকে হত্যা করা হয়। পরে শুক্রবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নথিতে বলা হয়, আবুগারবিয়েহ নিহত দুজনের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরে (আবর্জনা বা বর্জ্যকে সংকুচিত করে ফেলার বৈদ্যুতিক যন্ত্র) ফেলে দেন। সেখানে যে রক্তের নমুনা পাওয়া গেছে, তাতে বৃষ্টি ও লিমন দুজনের উপস্থিতির বিষয়েই নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা।

লোকেশন ট্র্যাক করে লিমন ও বৃষ্টির মোবাইল ফোনের কাছাকাছি এবং লিমনের মরদেহ ফেলে আসার স্থানে হিশামের ফোনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি ওই ফোনের মাধ্যমেই তিনি অনলাইনে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কিনেছেন এবং লাশ গুম করার উপায় নিয়ে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

এ ঘটনার তদন্তকারীরা বলছেন, আবুগারবিয়েহর গাড়ির ড্রাইভ ডেটা এবং লিমনের ফোনের লোকেশন মিলে গেছে। নজরদারি ক্যামেরার ভিডিও ও সেলফোন রেকর্ডও লিমন ও বৃষ্টির শেষ অবস্থানের সঙ্গে আবুগারবিয়েহর যোগাযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কৌঁসুলিদের দাবি, আবুগারবিয়েহ পুলিশের কাছে মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আলামত ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে আবুগারবিয়েহর হুন্দাই জেনেসিস জি৮০ গাড়িটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়েতে একটি লাইসেন্স প্লেট রিডারে ধরা পড়েছে। ঠিক ওই একই সময়ে লিমনের ফোনটিও ওই ব্রিজে থাকার সংকেত দিয়েছিল।

নথিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দারা আরও কিছু রেকর্ড ও ভিডিও ফুটেজ পেয়েছেন। সেখানে দেখা যায়, হুন্দাই গাড়িটি ইউএসএফ এলাকা থেকে রওনা দিয়ে কজওয়ে, ক্লিয়ারওয়াটার এবং স্যান্ড কি এলাকা ঘুরে গভীর রাতে টাম্পায় ফিরে এসেছে।

পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে আবুগারবিয়েহ বলেন, নিখোঁজ শিক্ষার্থীরা তার গাড়িতে ছিলেন না। লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথাও আবুগারবিয়েহ অস্বীকার করেন।

আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে, তিনি গোয়েন্দাদের বলেছিলেন, মাছ ধরার জায়গা খুঁজতেই তিনি ক্লিয়ারওয়াটারে গিয়েছিলেন। তবে গোয়েন্দারা যখন আবুগারবিয়েহকে লিমনের ফোনের রেকর্ডের কথা জানান, তখন তিনি তার বয়ান পাল্টে ফেলেন।

আবুগারবিয়েহ তখন বলেন, লিমন তাকে সেখানে নিয়ে যেতে বলেছিলেন এবং তিনি রাজি হয়েছিলেন।

আবুগারবিয়েহ আরও বলেন, তিনি তাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে চলে আসেন।

আদালতের নথি অনুযায়ী, গোয়েন্দারা যখন হুন্দাই গাড়িটি পরীক্ষা করেন, তখন গাড়িটি সদ্য পরিষ্কার করা হয়েছে বলে তাদের মনে হয়। আবুগারবিয়েহ ও লিমন যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেখানকার একটি ডাস্টবিন থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা। সেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইজল ওয়াইপস, ফিব্রিজ, ফানিয়ানস এবং আইরিশ স্প্রিং বডি ওয়াশ কেনার একটি সিভিএস রসিদ পান। রসিদে সময় লেখা ছিল ১৬ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিট। অর্থাৎ আবুগারবিয়েহ ক্লিয়ারওয়াটার থেকে ফেরার ঠিক পরপরই এসব জিনিস কেনা হয়।

তবে আবুগারবিয়েহ এসব জিনিস কেনার কথা অস্বীকার করেন। সিভিএসের ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ডেলিভারি ড্রাইভার এসব জিনিস কিনেছিলেন। ওই বাসায় থাকা মাথুর নামে আরেকজন গোয়েন্দাদের জানান, আবুগারবিয়েহই এসব জিনিস ডেলিভারির মাধ্যমে অর্ডার করেছিলেন। পরে আদালতের নথি অনুযায়ী, আবুগারবিয়েহর ফোনে ডোরড্যাশ অর্ডারের রেকর্ডও পাওয়া যায়।

তদন্তকারীরা আবর্জনার ভেতরে এক টুকরা রুপালি রঙের ডাক্ট টেপও পান। ওই টেপে একটি লাল দাগ ছিল, যা পরীক্ষায় রক্ত বলে প্রমাণিত হয়।

লিমনের শোবার ঘরে গোয়েন্দারা বৃষ্টির কয়েন পার্স, ইউএসএফ পরিচয়পত্র, কেডস এবং একটি ছাতা পান। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ভিডিওতে শেষবার তাকে এই ছাতা হাতেই দেখা গিয়েছিল।

মেডিকেল এক্সামিনারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, লিমনের শরীরে অসংখ্য জখম ও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার কবজি ও গোড়ালি ছিল বাঁধা। উদ্ধার করার সময় তার মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল। মেডিকেল এক্সামিনার তার পিঠের নিচের অংশে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার গভীর একটি ক্ষত শনাক্ত করেছেন, যা লিভার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ধারালো অস্ত্রের বহুবিধ আঘাতের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তার মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে হিশাম আবুগারবিয়েহর জন্য জামিনহীন আটকাদেশ চেয়েছেন কৌঁসুলিরা। তাদের যুক্তি, আবুগারবিয়েহর মুক্তি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।

টাম্পা বে টোয়েন্টিএইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার চলাকালে আবুগারবিয়েহ কারাগারে থাকবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারক। দোষী সাব্যস্ত হলে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। এদিকে লিমন ও বৃষ্টির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ।

এক বিবৃতিতে ইউএসএফ বলেছে, ‘জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির অকাল প্রয়াণে আমরা মর্মাহত। আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি এবং তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক লিমন ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন, আর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। ২৭ বছর বয়সী লিমন ও বৃষ্টি ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসে তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গত ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে পরিবারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবার। তদন্তে নেমে শুক্রবার লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ বৃষ্টির পরিবারকে ফোনে জানায়, তাকেও হত্যা করা হয়েছে। তবে এখনো বৃষ্টির মরদেহ পাওয়া যায়নি।

লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর তার রুমমেট ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আবুগারবিয়েহও এক সময় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, তার অপরাধমূলক ইতিহাস রয়েছে, যার মধ্যে ২০২৩ সালের চুরি ও শারীরিক আঘাতের অভিযোগ রয়েছে। সেই বছরই তার এক আত্মীয় তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার দুটি মামলা করেছিলেন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ