যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা বাড়লেও জটিলতা কাটেনি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৭ এপ্রিল) : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে নতুন এক আশার আলো দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এই আশাবাদ প্রবল হয়েছে যে, রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের অবসান হয়তো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ও এই সংকটের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সরাসরি হস্তক্ষেপে বিরোধের বেশকিছু ‘জটিল ও স্পর্শকাতর’ বিষয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক আবহের মধ্যেও তেহরান সতর্ক করে বলেছে যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে সৃষ্ট মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই সমঝোতা কার্যকর হলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান এই প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের রেকর্ড এক উল্লম্ফন ঘটে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার কবলে পড়বে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ম্যারাথন আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছিল। সেই অচলাবস্থা কাটাতে গত বুধবার তেহরানে যান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। তার এই সফরটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মুনিরের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার এবং চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, পরমাণু ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো বিপরীত মেরুতে। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে ইরান যেন পরবর্তী ২০ বছরের জন্য তাদের সব পরমাণু কার্যক্রম স্থগিত রাখে। বিপরীতে তেহরান এই সময়সীমা মাত্র ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। এ ছাড়া ইরান থেকে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া এবং তেহরানের ওপর আরোপিত সব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো নিয়ে দর-কষাকষি এখনো তুঙ্গে।
ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চললেও রণক্ষেত্রে উত্তেজনা কমেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি না হয়, তবে মার্কিন সেনারা পুনরায় পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে, এই যুদ্ধের সমান্তরালে লেবাননেও ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান চলছে। পাকিস্তান মনে করে, লেবাননে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি না হলে সামগ্রিক শান্তি আলোচনা সফল হবে না। গত বুধবার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা লেবানন ইস্যু নিয়ে বৈঠক করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, দীর্ঘ ৩৪ বছর পর আজ ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ফোনালাপ হতে পারে। যদিও লেবাননের কর্মকর্তারা এখনই এমন কোনো খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেননি।
যুদ্ধের ভয়াবহতা সাধারণ মানুষের ওপর চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এ পর্যন্ত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দেশটির সঙ্গে সংযোগকারী শেষ সেতুটিও ধসে পড়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কঠোর করেছে এবং সন্দেহভাজন যেকোনো জাহাজে তল্লাশি চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে এত উত্তেজনার মাঝেও শান্তি আলোচনার খবরে বিশ্ব শেয়ারবাজারে এক ধরনের স্বস্তি দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, দ্রুত কোনো সমাধান এলে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল হবে। এখন সারা বিশ্বের চোখ তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যেখানে পরমাণু ইস্যুই হয়ে দাঁড়িয়েছে শান্তির পথে প্রধান অন্তরায়।
যুদ্ধ এড়াতে হরমুজ নিয়ে ছাড় দিতে পারে ইরান: রিপোর্ট
কয়েক দিন আগে পর্যন্তও হরমুজ নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল ইরান। বলা হয়েছিল, ওই প্রণালি ব্যবহার করলে পণ্যবাহী জাহাজগুলোর কাছ থেকে শুল্ক আদায় করবে তেহরান।
হরমুজ নিয়ে আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তেহরানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিফহাল, এমন একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে দাবি করেছে যে, ওমানের উপকূল ধরে নিরাপদে হরমুজ পেরোতে পারবে জাহাজ কিংবা ট্যাঙ্কার। এই মর্মে ইরানের তরফে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে ওই সূত্রটির দাবি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এড়াতেই ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘আক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই ওমানের দিক দিয়ে হরমুজে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি ইরান ভেবে দেখছে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি শর্ত রেখেছে ইরান, তা হলো– ইরানের প্রায় সব দাবিই মেনে নিতে হবে আমেরিকাকে। এই বিষয়ে এখনো নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি হোয়াইট হাউস। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু বলা হয়নি।
অথচ কয়েক দিন আগে পর্যন্তও হরমুজ নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল ইরান। বলা হয়েছিল, ওই প্রণালি ব্যবহার করলে পণ্যবাহী জাহাজগুলোর কাছ থেকে শুল্ক আদায় করবে তেহরান। হরমুজে ইরানের আধিপত্য খর্ব করতে গত রবিবার এই প্রণালি অবরোধ করার কথা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে বিপাকে পড়ে পণ্যবাহী জাহাজ। বিশেষত তেলবাহী জাহাজগুলো। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, আল-জাজিরা
মনোয়ারুল হক/
