সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে নতুন বিতর্ক, আলোচনায় রাষ্ট্রপতি
বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১০ মার্চ) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি—বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদে বহাল থাকবেন, নাকি নতুন করে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সূত্রগুলো বলছে, নতুন সরকার আপাতত রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তনের পথে হাঁটছে না। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন বা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ পাঁচ বছর, যা শেষ হবে ২০২৮ সালের ২৪ এপ্রিল। ফলে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ সীমিত। কেবলমাত্র তিনি নিজে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হলে তবেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথ তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের প্রশ্নে এখনো ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, চলমান সাংবিধানিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের সূচনাতেই রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দিয়ে অধিবেশন শুরু করবেন। একই দিনে সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কথাও রয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাষ্ট্রপতির এই ভাষণের বিরোধিতা করছে এবং তাঁকে অভিশংসনের দাবিও তুলেছে। তাদের এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই দাবিকে এখনো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এদিকে সরকারিভাবে রাষ্ট্রপতির সংসদ ভাষণের খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেই ভাষণের খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি অপসারণের পথ আইনগতভাবে থাকলেও সেটি বাস্তবায়নের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয় এবং প্রক্রিয়াটিও জটিল। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়া সহজ নয়।
এদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বর্তমান রাষ্ট্রপতি একটি বিশেষ নজিরও সৃষ্টি করেছেন। তিনি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের তিনটি ভিন্ন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ পড়ান। পরবর্তীতে আগস্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানও তাঁর হাতেই সম্পন্ন হয়। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের শপথও তিনি পড়িয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের মতো বড় কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তখন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ও অবস্থান আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আপাতত সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে।
মনোয়ারুল হক/
