চীন থেকে সুপারসনিক এন্টি-শিপ মিসাইল কেনার চুক্তির কাছাকাছি ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৪ ফেব্রুয়ারি) : আলোচনার বিষয়ে অবগত ছয়জন ব্যক্তির সূত্রমতে, ইরান চীন থেকে জাহাজ-বিধ্বংসী (এন্টি-শিপ) ক্রুজ মিসাইল কেনার একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এমন এক সময়ে এই খবর এল, যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি উপকূলে বিশাল নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, চীনের তৈরি CM-302 মিসাইল কেনার চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে, যদিও এখনো হস্তান্তরের কোনো তারিখ ঠিক হয়নি। এই সুপারসনিক (শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী) মিসাইলগুলোর পাল্লা প্রায় ২৯০ কিলোমিটার এবং এগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে দ্রুতগতিতে উড়ে গিয়ে জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিসাইল মোতায়েন করা হলে ইরানের আক্রমণ ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে ব্রিফিং পাওয়া তিন কর্মকর্তা এবং তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ মোট ছয়জন জানান যে, এই মিসাইল সিস্টেম কেনার বিষয়ে অন্তত দুই বছর আগে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর এই আলোচনা দ্রুত গতি পায়। গত গ্রীষ্মে আলোচনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ইরানের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাসুদ ওরাইয়িসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তারা চীন সফর করেন। ওরাইয়ির এই সফরের খবর আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি।
ইসরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর সিনিয়র গবেষক এবং সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘‘ইরান যদি এই অঞ্চলে জাহাজ আক্রমণ করার জন্য সুপারসনিক সক্ষমতা অর্জন করে, তবে তা যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেবে। কারণ এই মিসাইলগুলো ঠেকানো অত্যন্ত কঠিন।’’
এই সম্ভাব্য চুক্তিতে কতগুলো মিসাইল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, ইরান কত টাকা দিতে রাজি হয়েছে, অথবা বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে চীন শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে কি না-এই বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘‘মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে এবং এই চুক্তিগুলো কাজে লাগানোর জন্য এখনই উপযুক্ত সময়।’’
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক মন্তব্যে জানায় যে, মিসাইল বিক্রির আলোচনা সম্পর্কে তারা অবগত নয়। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মিসাইল সিস্টেম নিয়ে ইরান ও চীনের এই আলোচনার বিষয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে একজন কর্মকর্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘‘হয় আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নয়তো গতবারের মতো আমাদের কঠোর কিছু করতে হবে।’’তিনি মূলত আবার হামলার হুমকিই দিয়েছেন।
এই মিসাইলগুলো হবে চীন থেকে ইরানে হস্তান্তরিত সবচেয়ে উন্নত সামরিক সরঞ্জামগুলোর একটি, যা ২০০৬ সালে আরোপিত এবং গত সেপ্টেম্বরে পুনরায় বলবৎ হওয়া জাতিসংঘ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার শামিল।
ইরানের কাছে মার্কিন বাহিনীর সমাবেশ
এই সম্ভাব্য বিক্রয় চুক্তিটি ইরান ও চীনের মধ্যে গভীরতর হতে থাকা সামরিক সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দেয়, যা ইরানের মিসাইল ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলবে। এটি সেই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সংকেত দেয়, যা দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল।
চীন, ইরান ও রাশিয়া প্রতিবছর যৌথ নৌ মহড়া চালায়। গত বছর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিতে রাসায়নিক উপাদান সরবরাহের অভিযোগে বেশ কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। চীন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল যে তারা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে মেনে চলে।
সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে স্বাগত জানানোর সময় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছিলেন, ‘‘ইরানের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় চীন তাকে সমর্থন করে।’’ গত ১৮ অক্টোবর চীন, রাশিয়া ও ইরান এক যৌথ চিঠিতে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে।
ইরান সরকারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া একজন কর্মকর্তার মতে, ‘‘ইরান এখন একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে যুদ্ধের ময়দান হয়ে উঠেছে।’’
এমন সময় এই চুক্তির খবর এল যখন যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ এবং ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’-সহ বিশাল নৌবহর ইরানের হামলাযোগ্য দূরত্বের মধ্যে জড়ো করছে। এই জাহাজগুলোতে ৫ হাজারের বেশি সেনাসদস্য এবং ১৫০টি যুদ্ধবিমান থাকতে পারে।
সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘‘চীন ইরানে কোনো পশ্চিমাপন্থী সরকার দেখতে চায় না। সেটি তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি হবে। তারা আশা করে যে বর্তমান সরকারই টিকে থাকবে।’’
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতে ১০ দিনের সময় দিয়েছেন, অন্যথায় সামরিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ১৩ ফেব্রুয়ারির এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্প নির্দেশ দিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহব্যাপী বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক পিটার ওয়েজেম্যান বলেন, গত বছরের যুদ্ধে ইরানের যে অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তা পূরণে CM-302 ক্রয় একটি বড় পদক্ষেপ হবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান CASIC এই CM-302 মিসাইলকে বিশ্বের সেরা জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল হিসেবে প্রচার করে, যা একটি বিমানবাহী রণতরী বা ডেস্ট্রয়ার ডুবিয়ে দিতে সক্ষম। এটি জাহাজ, বিমান বা মোবাইল গ্রাউন্ড ভেহিকেল থেকে উৎক্ষেপণ করা যায় এবং এটি স্থলের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারে।
ছয়টি সূত্রের দাবি, ইরান চীন থেকে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল, অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক অস্ত্র এবং স্যাটেলাইট-বিরোধী অস্ত্র কেনার বিষয়েও আলোচনা করছে। উল্লেখ্য, আশির দশকে চীন ইরানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল, কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক চাপে তা কমে আসে। সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তারা চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ইরানকে মিসাইল তৈরির সরঞ্জাম দেওয়ার অভিযোগ করলেও পূর্ণাঙ্গ মিসাইল সিস্টেম সরবরাহের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনেননি। সূত্র: রয়টার্স
মনোয়ারুল হক/
