ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকবেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৭ ফেব্রুয়ারি) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, জেনেভায় ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক আলোচনার দ্বিতীয় দফায় তিনি ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকবেন। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বৈঠকের জন্য সুইজারল্যান্ডের শহর জেনেভায় পৌঁছেছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনার আগে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা এখনো তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, মঙ্গলবারের আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমি ওই আলোচনায় পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকব। আর এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। ইরান খুব কঠিন দর-কষাকষি করে।’ চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘গত জুনে কঠোর অবস্থানের পরিণতি ইরান বুঝেছে।’ সে সময় ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেয় এবং ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়।
ওই হামলার সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। হামলার ফলে আলোচনা ভেস্তে যায়। তবে এবার তেহরান আলোচনায় আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, তারা চুক্তি না করার পরিণতি আবার দেখতে চায়।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরান চুক্তি চাইছে বলে মন্তব্য করলেও আলোচনায় বড় বাধা রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। তারা আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের মতো বিষয়ও যুক্ত করতে চায়।
কিন্তু তেহরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তারা জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে কেবল কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি। শূন্য মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তারা মেনে নেবে না। ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আলোচনার বাইরে থাকবে।
সোমবার জেনেভায় পৌঁছে আরাগচি বলেন, তিনি ‘ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক একটি চুক্তি অর্জনের বাস্তব ধারণা’ নিয়ে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যে বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে নেই—হুমকির সামনে আত্মসমর্পণ।’
জেনেভায় তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রসির সঙ্গেও কারিগরি আলোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান জাতিসংঘের তদারকি সংস্থা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করেছিল।
আইএইএ কয়েক মাস ধরে ইরানের কাছে জানতে চাচ্ছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তাদের ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের কী হয়েছে। সংস্থাটি পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন আবার শুরু করতে চায়। বিশেষ করে বোমা হামলার শিকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়: নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইস্পাহান।
তেহরান যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেখানে আইএইএকে কিছু প্রবেশাধিকার দিয়েছে। কিন্তু বিকিরণের ঝুঁকির কথা বলে অন্য স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শকদের যেতে দেয়নি। তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রসুল সরদার জানিয়েছেন, আলোচনার আগে ইরানের রাজধানীতে ‘আশাবাদ’ দেখা যাচ্ছে।
রসুল সরদার বলেন, জেনেভায় ইরানের প্রতিনিধিদলে পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক, আইনি, রাজনৈতিক ও কারিগরি দল রয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইরান গুরুতর কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত। বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। তবে সরদার বলেন, আলোচনার পাশাপাশি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক প্রস্তুতি চলছে এবং তা বাড়ছে। ইরানও পিছিয়ে নেই। সোমবার উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে শক্তিশালী ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সামরিক মহড়া চালায়।
ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে, কোনো হামলার জবাবে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রণালি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ। এটি বন্ধ হলে বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। ইরান আরও হুমকি দিয়েছে, হামলা হলে তারা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত হানতে পারে। এতে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। সরদার বলেন, ‘কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও চলছে। আঞ্চলিক দেশগুলোও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে। কারণ, তাদেরও নিজস্ব উদ্বেগ ও আশঙ্কা রয়েছে।’
মনোয়ারুল হক/
