বেনাপোল কাস্টমসে ছয় মাসে ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি
নিজস্ব প্রতিবেদক (যশোর), এবিসিনিউজবিডি, (১৩ জানুয়ারি) : যশোরের বেনাপোল কাস্টম হাউসে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কাস্টমস সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক এক দশকের মধ্যে এটি বেনাপোল কাস্টম হাউসের অন্যতম বড় রাজস্ব ঘাটতি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টম হাউসের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে বাস্তবে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২০ দশমিক শূন্য ৫ কোটি টাকা। এতে ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কাস্টমস ও বন্দর সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে। বাণিজ্যিক পরিবেশে এই অস্থিরতার কারণে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই গতি কমে গেছে। আগে যেখানে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ পণ্যবাহী ট্রাক আমদানি হতো, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে। একইভাবে আগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ ট্রাকে। আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই এই বড় ধরনের পতনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।
বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি-বাণিজ্যের স্থবিরতা, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বন্দরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম–এই তিনটি বিষয় মিলেই বেনাপোল কাস্টমের রাজস্ব সংকটকে আরও গভীর করেছে। তাদের মতে, বেনাপোল কাস্টমে ছয় মাসে এত বড় রাজস্ব ঘাটতি গত এক দশকে খুব কমই দেখা গেছে।
মাসভিত্তিক রাজস্ব পরিসংখ্যানেও পতনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রাজস্ব আদায় হলেও আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘাটতি বাড়তে শুরু করে। আগস্টে ৪৯৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৪৪৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে ৬০১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা, আদায় হয় ৫১৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। অক্টোবরে ৬৪৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা, আদায় হয় মাত্র ৪৪৯ দশমিক ২৮ কোটি টাকা। নভেম্বরে ৭৫৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা, আদায় হয় ৫৬৪ দশমিক ৪১ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই মাসে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৬০০ দশমিক ৮১ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বেনাপোল বন্দর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫২০ টন পণ্য। অথচ আগের অর্থবছরে একই সময়ে এবং পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছর মিলিয়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ টনেরও বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি-বাণিজ্যে ব্যাপক পতন ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বেনাপোল বন্দরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় ধস।
বিশেষ করে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্যের আমদানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শিল্পের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকস পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল আমদানি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এসব পণ্য থেকেই সরকারের শুল্ক ও ভ্যাট আয়ের বড় অংশ আসে। ফলে এসব পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে সরাসরি ও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতিই এই সংকটের একমাত্র কারণ নয়। কাস্টম হাউস ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যাও আমদানিকারকদের বেনাপোলমুখী আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। তাদের অভিযোগ, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম অনেক সময় ব্যবসায়ীদের বিকল্প স্থলবন্দর বা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আলহাজ মহসিন মিলন বলেন, ‘বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আগে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ পণ্যবাহী ট্রাক আমদানি হতো। এখন সেটা কমে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে নেমে এসেছে। একইভাবে আগে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হতো, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫০ ট্রাকে। আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আয়ও স্বাভাবিকভাবেই কমেছে।’
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল বিহারী বলেন, ‘প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে, বিষয়টি আমরা স্বীকার করছি। আমদানি-বাণিজ্য কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদারে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক উন্নতি দেখা যাবে।’
মনোয়ারুল হক/
