সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা আতঙ্কে

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১৩ জানুয়ারি) : নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে সরকার ১০ বছর মেয়াদি সুকুক বা ইসলামি বন্ডের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকদের ছোট অঙ্কের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সবাই সমান হারে টাকা পাচ্ছেন না। নীতিমালায় নানা ধরনের কৌশলী শর্তারোপের কারণে অনেক গ্রাহকই টাকা পাচ্ছেন না। গ্রাহক ভোগান্তি কমছে না। এমন অবস্থায় সরকার বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে নতুন এই ব্যাংকটি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তারা অভিযোগ করেছেন, এখনো ব্যাংকটি ঠিকভাবে চলতে শুরু করেনি। এর মধ্যেই যদি সরকার ব্যাংকটি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায়, তাহলে ব্যাংকটি চলবে কীভাবে? যে ব্যাংক গ্রাহকের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছে না, সেই ব্যাংক থেকে সরকার কেনইবা ঋণ নেবে?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বয়োজ্যেষ্ঠ গ্রাহক মো. আবু মাসুম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। যেখানে সরকার মূলধন সরবরাহ করেছে পাঁচ ব্যাংকের সাধারণ আমানতকারীদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিচ্ছে না। নানাভাবে গ্রাহকদের হয়রানি করছে। এতে সাধারণ আমানতকারীরা তাদের আমানত ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের অবস্থায় রয়ে গেছেন। তার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঘোষণা আমানতকারীদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যদি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে দেশে বর্তমানে যেসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি মজবুত আছে, সেসব ব্যাংক থেকে এ টাকা নিতে পারত। তা না করে যে ব্যাংকের কার্যক্রমই এখনো শুরু হলো না, সেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসলে সাধারণ আমানতকারীদের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। দায়বদ্ধতা থাকলে এখনো কার্যক্রম শুরু না হওয়া ব্যাংক থেকে সরকার কীভাবে ঋণ নেয়। তিনি আরও বলেন, ‘অবসরের পর আমার সব টাকা ছেলের নামে এক্সিম ব্যাংকে এফডিআর করে রেখেছিলাম। আমার বয়স ৮০ বছর। প্রতিদিন আমার অনেক টাকার ওষুধ লাগে। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পেরে আমার অসুস্থতা বেড়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, আমার টাকা ব্যাংকে রেখে আমি যদি চিকিৎসার অভাবে মারা যাই, তাহলে এর দায় কে নেবে? বাংলাদেশ ব্যাংক কি আইনিভাবে নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারে গ্রাহকদের এমন ভোগান্তিতে ফেলেছেন?’

গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, শরিয়াহ পদ্ধতিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে সরকার। এ জন্য ১০ বছর মেয়াদি সুকুক বা ইসলামি বন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যাংকটিকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দিয়েছে। তার অর্ধেক এই বন্ডে বিনিয়োগ করবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এটি হবে নবগঠিত এই ব্যাংকের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ থেকে বছরে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফা পাবে ব্যাংকটি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য পেইড অব ক্যাপিটাল হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বিমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হয়েছে, যা থেকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে ব্যাংকটির আয়ের একটি পথ তৈরি করে দিয়েছে সরকার। ভালো মুনাফা পেতে সরকারের বন্ডে বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে, তা ব্যাংকটির পেইড অব ক্যপিটাল। যতদূর জানি, এই টাকা থেকে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদের সভাপতিত্বে গঠিত শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কমিটি গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুটি সভা করে। এসব সভায় ইজারা পদ্ধতিতে এই সুকুক ইস্যুর বিষয়ে কমিটির সদস্যরা একমত হন। সরকারি কর্মচারীদের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্মিত সাতটি আবাসন প্রকল্প এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কিছু সেবায় এই সুকুক বন্ডের অর্থ বিনিয়োগ করা হবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ