সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকের যাত্রা শুরু আগামী সপ্তাহেই: গভর্নর

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩০ নভেম্বর) : একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংক নিয়ে নতুন ব্যাংকের যাত্রা আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘আমাদের অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কিছু করার দরকার ছিল। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করে পাঁচ ব্যাংক নিয়ে আমরা একটি নতুন ব্যাংক করতে যাচ্ছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এ ব্যাংকের লঞ্চিং (যাত্রা শুরু) হয়ে যাবে।’

শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। বণিক বার্তা আয়োজিত ‘ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও কথা বলেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, বিএসএমএর সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।

একীভূত ব্যাংকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকবে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘এরচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক আর হবে না। সরকারের সাহায্যেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একটি সবল ব্যাংক তৈরি করব আমরা।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সমস্যা আছে, এগুলোর গভীরতাও অনেক। এর পরও আমরা কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র অর্থনীতির উন্নয়ন করতে পেরেছি। বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সারপ্লাসসহ বৈশ্বিক লেনদেনে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।’ আসন্ন রমজানে বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো সংকট তৈরি হবে না বলেও জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘গত বছর রমজান মাসে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা সর্বোচ্চ সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। এ বছরেও কোনো সংকট দেখছি না।’

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘সরকার যখন ৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের কথা বলেছে, আমি ভেবেছিলাম এ হার তিন গুণ তথা ২৫ শতাংশ হতে পারে। এখন দেখি তা ৩৫ শতাংশ। দেশে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বর্তমানে খেলাপি ঋণ। ফলে পুরো ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়েই ব্যাংকগুলোকে চালাতে হচ্ছে। আমাদের ধাপে ধাপে এ সমস্যা থেকে উঠে আসতে হবে। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এ খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে।’

মূল্যস্ফীতির তুলনায় বর্তমান নীতি সুদহার বেশি নয় বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছিল। সে তুলনায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশ বেশি নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের তুলনায় সুদহারের পার্থক্য খুব বেশি নয়।’

সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে একটি গোষ্ঠীর কাছে চলে গেছে। তিনি বলেন, অর্থনীতি গণতন্ত্রের অংশ হতে হবে এবং এটি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হতে হবে। যতদিন অর্থনীতি শুধু একটি গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন দেশের সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে না। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন করা ছাড়া দেশের আর্থিক পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, ‘এ জন্য আমাদের নতুন একটি অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন গ্রামীণ জনগণও উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে, যেন তারা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারে।’

বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, “দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ‘চোর ধরা’ মনোভাবভিত্তিক। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। একটি অর্থনীতি যদি আস্থানির্ভর না হয়, তাহলে ব্যবসা বা বিনিয়োগ কিছুই আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারে না। আস্থা ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। আমাদের দেশে অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম করার মতো দায়বদ্ধতার কাঠামো নেই। দেশের করব্যবস্থা আজও ‘জমিদারি ব্যবস্থার’ মতো আচরণ করে। ব্রিটিশ শাসনে জমিদারের কাজ ছিল কর আদায়। দেশের উন্নতির দায়িত্ব তাদের ছিল না। আজকের কর সংগ্রহেও একই মানসিকতা দেখা যায়, যেন দেশের উন্নতি নয়, শুধু কর আদায়ই মূল লক্ষ্য।”

বিএসএমএ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি কোম্পানি লাভ করুক বা লোকসান করুক, তাকে কর দিতে হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও এভাবে লোকসানেও কর দিতে হয় কি না জানা নেই। সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশের ব্যাংকগুলোতে এখন সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। আগে বোর্ডরুমে বসে ঋণ বিক্রি করা হতো। এখন নিয়ম অনুসারে অনুমোদন হচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা সংগত কারণেই হয়তো সময় নিচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত হবে বলে জানান তিনি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ