বকেয়া কর আদায়ে অভিযানে নামছে এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩০ নভেম্বর) : গত ১৫-১৬ বছরে বকেয়া করের পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বকেয়ার বেশির ভাগই বড় মাপের করদাতাদের কাছে পাওনা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বারবার তাগাদা দিলেও বকেয়ার বেশির ভাগই আদায় হয়নি। এবার বকেয়া আদায়ে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ৫০ লাখ টাকা বকেয়া আছে এমন করদাতাদের এনবিআরে তলব করা হবে। বকেয়া পরিশোধে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হবে। এভাবে সর্বোচ্চ তিন থেকে চারবার সময় বাড়ানোর পরও বকেয়ার অর্ধেকের বেশি পরিশোধ না করলে সম্পত্তি ও হিসাব জব্দ করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রাজস্ব খাতের বিশ্লেষকরা বলেছেন, সরকার অর্থসংকটে আছে। আয় বাড়াতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এনবিআরের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এনবিআরের কাছে যে পরিমাণ বকেয়া কর জমা আছে, তা আদায় করতে সক্ষম হলে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েও বাড়তি থাকবে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরে চিঠি পাঠিয়ে আয়কর আদায়ে জোর বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বকেয়া কর আদায়ে সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের কর্মকর্তাদের নিয়ে এরই মধ্যে টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কর্মকর্তারা বিভিন্ন কর অঞ্চল থেকে কার কাছে কত বকেয়া আছে তালিকা সংগ্রহ করে আদায়ে নামবেন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘এনবিআর অনেক চেষ্টা করেও ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ না দিয়ে ধনী কর ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে করি। এসব ব্যক্তির সক্ষমতা থাকার পরও বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর বকেয়া পরিশোধ করেন না। বেশির ভাগ ধনী করদাতা মামলা করে পুরো আদায় প্রক্রিয়া আটকে রাখেন। অনেক আয়কর মামলা আটকে আছে। কবে নিষ্পত্তি হবে তা অনিশ্চিত। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনী করদাতাদের বকেয়া আদায়ের তাগাদা দেওয়া হলে শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে মামলা করে থাকে। এরই মধ্যে বিচারাধীন রাজস্ব মামলার সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এখানে জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এনবিআর থেকে রাজস্ব মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইনের (এডিআর) আওতায় নিষ্পত্তিতে আহ্বান জানালেও কেউ আসছে না বললেই চলে। এডিআরে বড় অঙ্কের করদাতাদের পাওনার পরিমাণে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া এডিআর ফি কমানোর ক্ষেত্রে নতুন হিসাব কষা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে অর্থবছরের মাঝামাঝি লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। নতুন লক্ষ্যমাত্রা বিদ্যমান লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় এবারে প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আয়কর খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা না হলে মোট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে না।

এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ‘নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় বাড়ানো চ্যালেঞ্জিং হলেও এনবিআর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। বহুদিনের বকেয়া কর আদায় করতে এনবিআর নতুন কৌশল নিচ্ছে। আশা করি এতে কাজ হবে।’

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই থেকে অক্টোবর রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ধনী এবং উচ্চমধ্যবিত্তদের শতকরা ৮৭ ভাগই আয়কর দেন না। কর প্রশাসনের অদক্ষতা ও কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা এই কর ফাঁকি দিচ্ছেন। এ কারণে এনবিআর কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না। দেশে ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যে আয়কর দেওয়া লোকের সংখ্যা ৯-১০ লাখ হবে। এই সংখ্যা হওয়ার কথা ৭৮ লাখ ৩২ হাজার। এর মানে, ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তদের ৮৭ শতাংশ কোনো ধরনের আয়কর দেন না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে আয়কর আদায়ের ওপর জোর দেওয়া উচিত। যেটা ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো ঘটনা ঘটছে। আর এখানে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ১০ শতাংশের ঘরে, যা এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এখানে ধনী ব্যক্তিরাই বেশি ফাঁকি দিচ্ছেন।

সিপিডির এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে কোটি টাকা আয় করেন এ রকম জনগোষ্ঠীর ৬৭ শতাংশ কর আওতার বাইরে আছেন। এরা সারা দেশেই ছড়িয়ে আছেন। কিন্তু এদের করের আওতায় আনা যাচ্ছে না। আবার আনলেও ঠিকমতো কর দেন না। রাষ্ট্রযন্ত্র শক্তিশালী না হলে ধনীদের কাছ থেকে আয়কর আদায় সম্ভব নয়। কারণ তারা প্রভাশালী, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। তাদের ছাড় দেওয়া হয়। দেশে গ্রাম পর্যন্ত এখন বহু লোক গাড়ি-বাড়ি হাঁকান, কিন্তু তারা আয়কর দেন না। যারা কর ফাঁকি দেন, তাদের কর দিতে বাধ্য করতে হবে। এ জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, আইন প্রয়োগ করতে হবে। শাস্তি ও প্রণোদনা দুটোই দিতে হবে।’

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Facebook
ব্রেকিং নিউজ