ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ জামায়াতের

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৯ অক্টোবর): ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বলপ্রয়োগ, পক্ষপাতিত্ব ও ব্যালট পেপারে আগে থেকেই সিল মেরে রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব অভিযোগের কথা তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বহু ভোটার কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই তাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে—এমন তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। পাশাপাশি, সাধারণ ভোটারদের মনে ভীতি তৈরি করা, পোলিং এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তার কাছে বৈধ পরিচয়পত্র না থাকার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় আমরা গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছি।

সরকারঘোষিত দাবির সমালোচনা করে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এই উপনির্বাচনটিকে সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূণ বলে দাবি করা হলেও মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে দেশবাসীর সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে দাবি করা বাস্তবতার চরম পরিপন্থী এবং এটি মূলত দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার একটি অপচেষ্টা মাত্র।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাইরুজ ইসলামের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে একটি বিশেষ দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ ওঠার পরও তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়নি। অথচ নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত করতে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সরিয়ে নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছিল।

ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি একজন নারী ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন যে তার ভোটটি আগেই দেওয়া হয়ে গেছে—এমন একটি ঘটনার ভিডিও ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এনে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের মাঝে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত চাকরিজীবী এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সুনির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তারা ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পক্ষে অবস্থান নিলে তাদের চাকরি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এর মধ্য দিয়ে নাগরিকদের স্বাধীন ও সাংবিধানিক ভোটাধিকার নির্মমভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী বিধি ভেঙে নির্ধারিত সময়ের আগে প্রচারণা চালানো এবং ‘ধানের শীষ’ প্রতীক রঙিন পোস্টারে ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ ছবি নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। আমাদের নেতাকর্মীদের শারীরিকভাবে মারধর, নারী ভোটারদের বাধা প্রদান এবং কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে নিয়োজিত প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের কোনো ধরনের দৃশ্যমান পরিচয়পত্র কিংবা অফিশিয়াল ব্যাজ ছিল না। এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হলে তারা কোনো সন্তোষজনক বা যথাযথ পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হন। এছাড়া কয়েকটি ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগে থেকেই সিল ও স্বাক্ষর করে রাখার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত এবং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সুপরিকল্পিতভাবে জাল ভোটের সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে পুরো নির্বাচনী এলাকায় অবাধে অর্থ বিতরণের খবরও আমাদের কাছে এসেছে। এসব লোমহর্ষক ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি।

ভোটকেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই নির্বাচন নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয় না। তবে সাধারণ ভোটারদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, জাল ভোট প্রদান রোধ করতে এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাঠে সেনাবাহিনীর একটি কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা থাকা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

পরিশেষে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, একটিমাত্র স্থানীয় উপনির্বাচনে যদি এই ধরনের অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগগুলো কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় থেকেই যাবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ