রাতারাতি ধনী হওয়ার ফাঁদ থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৩ অক্টোবর): রাজধানীর নিকুঞ্জের ডিএসই ভবনে সোমবার শেষ হয়েছে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ’র সমাপনী অনুষ্ঠান। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাপনী অনুষ্ঠানে মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ডিজিটাল প্রতারণা ও সতর্কতা’। অনুষ্ঠানে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং রাতারাতি বড়লোক হওয়ার ফাঁদ থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দূরে থাকার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন পুঁজিবাজারের নীতিনির্ধারকরা।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বিনিয়োগকারী সচেতনতা কেবল এক সপ্তাহের বিষয় নয়; এটি বছরব্যাপী চালিয়ে যেতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মুনাফা মূলত একটি হিসাবমাত্র, কিন্তু নগদ টাকাই হলো বাস্তব সত্য। তাই শুধু খাতার মুনাফা না দেখে কোম্পানির পরিচালন নগদপ্রবাহ পজিটিভ আছে কিনা, তা যাচাই করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এছাড়া ঘোড়াকে পানির কাছে নেওয়া গেলেও জোর করে পানি খাওয়ানো যায় না—এই প্রবাদের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব শেখার মানসিকতা তৈরি না হলে কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে প্রতারণা রোধ করা সম্ভব নয়।
বিএসইসি চেয়ারম্যান আরও জানান, আগামী ৩০ নভেম্বর শেষ হতে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ ও আকার বাড়ানোর বিষয়ে গভর্নরের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি, আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও যুগোপযোগী করতে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা শিগগিরই জনমতের জন্য প্রকাশ করা হবে। অডিট প্রক্রিয়ায় বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা রেখে আইপিও অনুমোদনের সময়সীমা দুই মাসে নামিয়ে আনা এবং আইপিওর অর্থে ঋণ পরিশোধের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অবাধ প্রবাহই বাজারের মূল চালিকাশক্তি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ডিএসই বা বিএসইসির লোগো ব্যবহার করে নিজেদের বিশেষজ্ঞ সাজিয়ে প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এই ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি রোধে ডিএসই নিজস্ব সার্ভেইল্যান্স ও মনিটরিং প্রযুক্তি আধুনিক করার কাজ শুরু করেছে।
বিএসইসির কমিশনার নাফিজ আল তারিক বিনিয়োগকারীদের অতিমুনাফার লোভ সংবরণ করার পরামর্শ দিয়ে বার্নার্ড ম্যাডফের পঞ্জি স্কিমের উদাহরণ দেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, অস্বাভাবিক ও ধারাবাহিক স্থিতিশীল মুনাফা দেখানোর ফান্ড দেখলে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা উচিত। এ সময় তিনি ওয়ারেন বাফেটের বিখ্যাত দুটি সূত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেন—প্রথমত কখনোই মূলধন হারানো যাবে না, এবং দ্বিতীয়ত প্রথম নিয়মটি কখনোই ভুলে যাওয়া যাবে না।
অনুষ্ঠানে বিএসইসির অন্য কমিশনাররা পুঁজিবাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন। কমিশনার নাহিদ মাহতাব বলেন, ডিজিটাল প্রতারণা শুধু সাইবার অপরাধ নয়, এটি বাজারের স্বচ্ছতা ও আস্থার ওপর বড় আঘাত। কমিশনার হোসেন সাদাত পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে জানা, বোঝা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেন, আর কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান হিসাবের স্বচ্ছতা ও সঠিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার আহ্বান জানান।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্রোকারদের নৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও ন্যূনতম আর্থিক সাক্ষরতা অর্জন করে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসইর আইসিটি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবু নূর মোহাম্মদ হাসানুল করিম।
মনোয়ারুল হক/
