যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের মাথাব্যথা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৩ অক্টোবর): যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতেই ভোটাররা এরই মধ্যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোট দেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু এই সংকটময় মুহূর্তে নিজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় ট্রাম্প মূলত বৈদেশিক কূটনীতির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাশিয়া।
তবে বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণ কখনো সহজে মেলানো যায় না। কোনো ধরনের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার আগেই জ্বালানির মূল্য কমাতে ট্রাম্পের নেওয়া নানামুখী উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার মুখে প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এই উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে শুক্রবার বিকেলে, যখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আসন্ন মাসগুলোতে রাশিয়া থেকে শত শত কোটি টন ডিজেল পাওয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। বর্তমান সময়ে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বিশেষ করে মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের কৃষিনির্ভর রাজ্যগুলোতে—যেখানে কৃষিযন্ত্র সচল রাখতে এবং বাজারে উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করতে ডিজেল অপরিহার্য—ভোটারদের মাঝে তীব্র হতাশার জন্ম দিয়েছে। জনমত জরিপগুলো বলছে, সাধারণ মানুষ ইরান যুদ্ধকেই তাদের এই অর্থনৈতিক দুর্দশার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন এবং তার প্রশাসন কর্তৃক ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন অর্থনীতি পরিচালনার সফলতার হার বেশ দ্রুত নিচের দিকে নামছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে রুশ এই চুক্তিকে “আমেরিকানদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিয়ে আসার” বড় সাফল্য বলে প্রচার করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগকে এমন সব নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার নির্দেশ দেন, যার কারণে এতদিন বিশ্ববাজারে রুশ ডিজেল বিক্রি বন্ধ ছিল। এর মাত্র দুই দিন পর সামাজিক মাধ্যমে ফিরে এসে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি নতুন জ্বালানি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে জানান তিনি।
তবে এর পেছনের বাস্তব চিত্র ছিল ঢের বেশি জটিল। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান যে, এই চুক্তির ব্যাপারে তাকে আগে থেকে কোনো কিছু জানানো হয়নি, যদিও তিনি বলেছেন কিয়েভ এটি মেনে চলতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয় এবং রবিবার রাতেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে নতুন দমে বিমান হামলা শুরু করে মস্কো।
সোমবার এক ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি মন্তব্য করেন, “এটা স্পষ্ট যে পুতিন ট্রুথ সোশ্যাল পড়েন না।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই শীত মৌসুমে রাশিয়া যদি জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়, তবে আমরাও উপযুক্ত জবাব দিতে বাধ্য হব।”
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার এবং জেলেনস্কির মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত অস্থিরতাপূর্ণ। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর যে সংঘাত নিমিষেই শেষ করা সম্ভব বলে তিনি দাবি করেছিলেন, সেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনো রাশিয়া আবার কখনো ইউক্রেনকে দুষছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জেলেনস্কিই ট্রাম্পের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, কারণ রুশ তেল অবকাঠামোগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ঘাটতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে।
শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এমন ইঙ্গিতও দেন যে, ইউক্রেনের জন্য এখন একজন নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলেনস্কি যদি রুশ শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ না করেন, তবে ইউক্রেনের অস্ত্র বিক্রি এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার কঠোর হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, জেলেনস্কিকে এবার ‘যথাযথভাবেই এটি থামাতেই হবে’।
স্বাধীন থিঙ্ক-ট্যাংক প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘ এক দশকের একটি প্রকাশ্য রেকর্ড রয়েছে। যারা তার ইচ্ছা অনুযায়ী, ঠিক যখন এবং যেভাবে তিনি চান সেভাবে কাজ করেন না, তাদের ওপর চড়াও হওয়ার পুরোনো অভ্যাস তার রয়েছে।”
বর্তমানের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, কোনো কূটনৈতিক চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তা ফলাও করে প্রচার করার ট্রাম্পের সেই পুরোনো স্বভাবের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে তার এই “জ্বালানি যুদ্ধবিরতি” উদযাপনের বিষয়টি। অতীতেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি বা বড় ধরনের শান্তি চুক্তিগুলো সময়ের আগেই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। কূটনীতির শীর গতিতে প্রেসিডেন্টের স্বাভাবিক অধৈর্য কিংবা কোনো চুক্তিকে সফল করার একটি চতুর কৌশল—যাই হোক না কেন, এর ফলস্বরূপ বিশ্বজুড়ে এক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এখন বুঝতে চাইছে এর মূল তাৎপর্য কী এবং এর বিপরীতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত।
সেই প্রতিক্রিয়া আসতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই জ্বালানি যুদ্ধবিরতির প্রতি একধরনের “দৃঢ় সমর্থন” ব্যক্ত করেছেন। তবে ডিজেল আমদানির চুক্তিটির কঠোর নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন যে, এটি ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার “অবৈধ ও অহেতুক যুদ্ধকে” আর্থিকভাবে সচল রাখতে সহায়তা করছে।
এদিকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও ট্রাম্পের এই ডিজেল ঘোষণা নিজ দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। চারজন রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রেসিডেন্টকে “অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার” করার জোরালো দাবি জানিয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
রবিবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে সেনেটররা উল্লেখ করেন, “ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের নৃশংস আগ্রাসনে মার্কিন ডলারের অর্থায়ন পুরোপুরি ঠেকাতে ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি সেই আইনের পরিপন্থী।”
প্রেসিডেন্টের জন্য এর চেয়েও বড় হতাশার বিষয় হলো, যুদ্ধবিরতির কথা ফলাও করে প্রচার করা সত্ত্বেও বাজারে ডিজেলের দামে এর তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতা থেকে সামান্য কমলেও এখনো তা প্রতি গ্যালন ছয় ডলারের বেশ ওপরেই অবস্থান করছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের এই চরম নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সহিংসতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আরও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের নতুন করে চালানো হামলা—যাতে সপ্তাহান্তে অন্তত ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে—এক দশক ধরে চলে আসা এই আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, “হুথিরা এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে এটি কেবল সামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামো নয়, তারা বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতেও আঘাত হানবে যা অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।” তিনি আরও জানান, অঞ্চলের কোনো আরব দেশই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতটি চায়নি, আর সাম্প্রতিক হুথি আক্রমণ ছিল তারই এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মাঝে যেকোনো নতুন শত্রুতা আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামকে আরও আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগে, এটি আরও খারাপের দিকে যাবে বলেই আমার আশঙ্কা।”
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পরিবর্তে ইউক্রেনকেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি ইরানের সামরিক হুমকির মুখে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার চলাচল বৃদ্ধির বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। তবে এটি একধরনের মানসিক সান্ত্বনা বা আশাবাদী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র—আমেরিকান জনগণের জ্বালানি নিয়ে তৈরি হওয়া চরম ক্ষোভকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার একটি সুকৌশলী অপচেষ্টা। যাতে ভোটারদের দৃষ্টি এমন এক পরিস্থিতির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, যার সূত্রপাত হয়েছিল অন্য কোনো পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টের আমলে।
তবে নির্মম বাস্তবতা হলো, যেকোনো সময়ে একজনই প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকেন। আর মার্কিন ভোটাররা যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তখন তারা সচরাচর বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তির ওপরই এর দায়ভার চাপান। একটি অত্যন্ত কঠিন ও বিশৃঙ্খল সপ্তাহ শেষে এটি আবারও প্রমাণিত হলো যে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কোনো সহজ বা জাদুকরী সমাধান নেই, আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে এর চেয়ে খারাপ খবর আর কিছু হতে পারে না। সূত্র: বিবিসি
মনোয়ারুল হক/
