বড় ঋণখেলাপিদের বড় ছাড় বাংলাদেশ ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১ সেপ্টেম্বর): দেশের ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বড় গ্রহীতাদের বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ হাজার কোটি টাকা বা ততোধিক অঙ্কের ঋণ থাকা বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট গ্রুপগুলো এখন থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ পাবে। এর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ শুরুর আগে সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা বিরতিকাল ভোগ করতে পারবেন গ্রাহকরা।

সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করা হয়। দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় এই বিশেষ সুবিধা কার্যকরের কথা জানানো হয়েছে।

এক হাজার কোটি টাকার কম অঙ্কের ঋণখেলাপিরা এই সুযোগ পাবেন না। এই সুযোগ নিতে আগ্রহীদের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ওই সব আবেদন নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-সহায়তার আওতায় যারা সুবিধা নিয়েছেন, তারা নতুন করে আবেদন জমা দিতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিও দেখা যায়। চলতি বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, খেলাপি ঋণ কমিয়ে কলকারখানা চালু করতে এই সুবিধা আবার দেওয়া হয়েছে। চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্য কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ ‘খারাপ’ হয়ে গেছে। মূলত তাদের সুবিধা দিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের বাড়তি সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের যে কৌশল সরকার নিয়েছে, সেটির সফলতা নির্ভর করছে সিদ্ধান্তটির যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর। তাদের মতে, এর অপব্যবহার করে বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কেউ যেন অন্যায়ভাবে সুবিধা না নিতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংককে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এই বার্তাও দিতে হবে যে, এই সুযোগ পরে আর দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।

এর আগে ২০২৫ সালে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ব্যাংকার ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির ওপর কমপক্ষে ২ শতাংশ নগদে অর্থ জমা দিতে হবে। তাতে ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধে বিরতি) তা পরিশোধে ১০ বছর সময় পাওয়া যাবে।

তবে এর আগে ঋণ তিনবার বা এর চেয়ে বেশিবার পুনঃতফসিল করা হলে অতিরিক্ত ১ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার ক্ষতির পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগে যারা বিশেষ সুবিধার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন, তাদের সেই মেয়াদ বাদ দিতে হবে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অশ্রেণীকৃত ঋণকে বিশেষ পুনর্গঠন এবং শ্রেণীকৃত ঋণকে বিশেষ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়া যাবে। তবে এসব সুবিধা পেতে ঋণগ্রহীতাকে প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।

এ-সংক্রান্ত আগের জারি করা সার্কুলার ও অন্যান্য নির্দেশ অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন এ নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে ১ কোটি টাকার কম এমন ঋণের মধ্যে ১৬ শতাংশ খেলাপি। অন্যদিকে ৫০ কোটি টাকার বেশি এমন ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপির খাতায় উঠেছে। ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের আকারের বিপরীতে খেলাপির হারের চিত্র তুলে ধরে গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়, কীভাবে দেশের বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন।

ব্যাংক নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণ ফেরত দেন। কিন্তু বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ