রয়টার্সের বিশ্লেষণ: ব্যর্থ প্রেসক্রিপশন, পুরোনো ফাঁদেই পা দিচ্ছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৮ জুলাই) : ইরানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমাগত বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের এই অতি-সামরিকীকরণ নীতি তেহরানকে আদৌ নমনীয় করতে পারবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে।

সাড়ে চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে বিশ্লেষকদের স্পষ্ট মত—বলপ্রয়োগের মাধ্যমে একতরফা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার যে কৌশল অতীতে ব্যর্থ হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সেই পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন।

মাত্র এক মাস আগে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য খর্ব করার মার্কিন চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক তেল বাজার ও অর্থনীতিতে। যদিও দুই পক্ষ এখন পর্যন্ত সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে চলছে, তবুও সংকট সমাধানের কূটনৈতিক পথ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে।

চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ছয় দিন ধরে চলা এই সংঘাতের রেশ এখন আর কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানেন, তবে তেহরান তার মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালি’ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছে।

ভূরাজনৈতিক এই অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলের মধ্যেই মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প এখন ইরানের জ্বালানি কেন্দ্র, সংযোগ সেতু এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে’ বোমাবর্ষণের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা করছেন। এমনকি ইরানের প্রধান তেল হাব ‘খার্গ দ্বীপ’ দখলে স্থলসেনা পাঠানোর ব্লুপ্রিন্টও মার্কিন টেবিলে রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের জোগান পুরোপুরি স্থবির করে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

দীর্ঘ সাড়ে চার মাসের এই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতি হলেও, তেহরানের নীতিনির্ধারকদের অবস্থান চুল পরিমাণ নড়ানো যায়নি। আটলান্টিক কাউন্সিলের সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ মনে করেন, ট্রাম্পের এই নতুন হামলার পরিকল্পনা ইরানিদের অবস্থান বদলাতে পারবে না, বরং এটি তাদের আরও কট্টর ও জেদি করে তুলবে।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস কূটনীতির কথা বললেও তাদের দাবি—ইরান কেবল সামরিক শক্তির ভাষাই বোঝে। আর সে কারণেই হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপের পাশাপাশি ইরানের তেল বিক্রির বিশেষ ছাড়পত্র বাতিল করেছে ওয়াশিংটন।

ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী অবস্থানের পেছনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণও জড়িয়ে রয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই যুদ্ধ এরই মধ্যে ইরান ও লেবাননের হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, যা ওয়াশিংটনকে চরম নৈতিক সংকটে ফেলেছে। পাশাপাশি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে, তা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিংয়ে বড় ধস নামিয়েছে। ইসরায়েলি গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, মার্কিন প্রশাসন যতই চাপ তৈরি করুক, ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করবে না। ট্রাম্প হামলার পরিধি বাড়ালে তেহরানের পক্ষ থেকেও সমানুপাতিক পাল্টা আঘাত আসবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আগুনে ছাই করে দিতে পারে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ