অর্থনৈতিক উত্তরণ ও প্রবৃদ্ধির মহাপরিকল্পনা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঐতিহাসিক প্রস্তাবিত বাজেট
বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১১ জুন) : ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে পেশ করা হয়েছে দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট।
এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই সংস্কার’—কে মূল মন্ত্র করে প্রণীত এই বাজেটটি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরানো এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির এক মহাপরিকল্পনা।
এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো:
| প্রধান সূচক | প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা / পরিমাণ |
| মোট বাজেটের আকার | ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা |
| জিডিপির অনুপাত | ১৩.৭ শতাংশ |
| চলতি অর্থবছরের চেয়ে বৃদ্ধি | ১,৪৮,০০০ কোটি টাকা |
| রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা | ৬,৯৫,০০০ কোটি টাকা |
| বাজেট ঘাটতি | ২,৪৩,০০০ কোটি টাকা |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা | ৬.৫ শতাংশ |
| মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা | ৭.৫ শতাংশ (নামিয়ে আনার লক্ষ্য) |
ঘোষিত এই বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধির বার্তা দেয়। এই বিশাল বরাদ্দের পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩.৭ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে একে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বড় হাতিয়ার বলা হলেও, ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং ৬ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা।
সীমিত সম্পদের মধ্যেও এবারের বাজেটে জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট উপস্থাপনের আগে জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সব স্তরের মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়াই এর লক্ষ্য।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতের জন্য ৬৯ হাজার৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অতীতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন, নাগরিকদের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং ৫ হাজার নতুন চিকিৎসকসহ মোট ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের যুগান্তকারী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য ক্যানসার ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, কিডনি ডায়ালিসিস সামগ্রী, ল্যাপটপ-কম্পিউটার ও এক্সেসরিজ, শিশুখাদ্য, সব ধরনের মসলা, খেজুর, সার ও কীটনাশক এবং পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত কয়েক বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে আটকে থাকলেও আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বেশ সাহসী পদক্ষেপ। তবে বিশ্বব্যাংক যেখানে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে ৪.৬ শতাংশ, সেখানে এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের লাগাম টেনে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনাই হবে এই বাজেটের সফলতার মূল চাবিকাঠি।
নির্বাচিত সরকারের এই বাজেট নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক আকাশচুম্বী। আমরা একটি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এই বাজেট কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি দেশের সব মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করার একটি সামাজিক অঙ্গীকার।
দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিয়ে এই বিশাল বাজেট কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
মনোয়ারুল হক/
