বর্ষবরণে বর্ণাঢ্য সাজে সেজেছে চারুকলা

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১৪ এপ্রিল) : পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে উৎসবের আবহে সেজে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। নতুন বছরকে বরণ করতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা। রং, কাগজ, বাঁশ ও কাপড়ে ফুটে উঠছে বাঙালির ঐতিহ্য, প্রত্যাশা আর সাংস্কৃতিক চেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ।

এবারের শোভাযাত্রার নাম রাখা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। প্রতিপাদ্য— ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে প্রতিটি মোটিফ ও উপকরণ। লোকজ ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা তুলে ধরতে এবার পাঁচটি প্রধান মোটিফকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চারুকলা প্রাঙ্গণে ঢুকলেই চোখে পড়ে ব্যস্ততার এক জীবন্ত চিত্র। কোথাও বিশাল মুখোশে রঙ তুলির আঁচড়, কোথাও বাঁশের কাঠামো তৈরি, আবার কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজে শেষ ছোঁয়া দিচ্ছেন শিল্পীরা। বাঘ, পাখি, মাছসহ নানা প্রতীকী উপাদান ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

এবারের আয়োজনের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ বিশাল লাল ঝুঁটিওয়ালা মোরগ—যা নতুন ভোর ও জাগরণের প্রতীক হিসেবে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি পটচিত্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, গাজীরপট, আকবর, বনবিবি ও বেহুলার গল্প। প্রতিটি চিত্রেই রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের গভীর ছাপ।

চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থী শিল্পী হোসাইন আহমেদ বলেন, লাল ঝুঁটির মোরগ নতুন সূচনা ও অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে এগোনোর প্রতীক। দোতারা আমাদের শিকড় ও লোকসংগীতের প্রতিনিধিত্ব করে, যা বাউল ও লোকশিল্পীদের প্রাপ্য সম্মানের কথাও মনে করিয়ে দেয়।

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে তৈরি কাঠের হাতি ঐতিহ্য, শক্তি ও আভিজাত্যের প্রতীক। টেপা ঘোড়ায় গ্রামীণ জীবনের সরলতা ফুটে ওঠে, আর শান্তির পায়রা সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তির বার্তা বহন করে—যা পুরো আয়োজনকে আরও মানবিক করে তুলেছে।

মোটিফগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে চারুকলা অনুষদের ডিন ও নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্য-সচিব অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, এবারের শোভাযাত্রায় নতুন সূচনা, ঐতিহ্য এবং সামাজিক প্রত্যাশা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। মোরগের পেছনের লাল সূর্য নতুন দিনের আশা ও গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের প্রতীক।

শিক্ষার্থী সামিয়া হক জানান, সময় যত ঘনিয়ে আসছে, কাজের চাপ ততই বাড়ছে। তবুও সবাই ক্লান্তি ভুলে কাজ করে যাচ্ছেন, যাতে এবারের আয়োজন আরও বর্ণিল ও অর্থবহ হয়। তার মতে, এই শোভাযাত্রা শুধু উৎসব নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য ও সামষ্টিক চেতনাকে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

চারুকলার সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি বকুলতলায় বসেছে সাংস্কৃতিক আসর। গান, কবিতা আবৃত্তি ও আড্ডায় জমে উঠেছে উৎসবের পরিবেশ। লোকগান আর বৈশাখী সুরে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।

এ আয়োজন দেখতে ভিড় করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ মোটিফ ঘুরে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে উপভোগ করছেন উৎসবের আনন্দ।

দর্শনার্থী শ্যামলী জাহান বলেন, এই আয়োজনের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করেন তিনি। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নিতে পারেন, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্যাম্পাসজুড়ে মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং প্রক্টরিয়াল টিমও সতর্ক রয়েছে।

তিনি আরও জানান, কাজ প্রায় শেষের দিকে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিরলস পরিশ্রম করছেন, এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে চারুকলা অনুষদ এখন উৎসবের রঙে, সুরে ও সৃজনশীলতায় ভরপুর। প্রস্তুত হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব—পহেলা বৈশাখ।

নববর্ষ উপলক্ষে নির্দেশনা

নববর্ষ উদযাপন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। পহেলা বৈশাখে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরা ও ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ, তবে চারুকলার তৈরি মুখোশ হাতে রাখা যাবে। ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সব অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে সেদিন ক্যাম্পাসে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে এবং মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।

এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কিছু গেট বন্ধ থাকবে এবং নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে হবে। টিএসসি এলাকায় থাকবে হেল্পডেস্ক, কন্ট্রোল রুম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প, পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বসানো হবে মোবাইল টয়লেট।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ