আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১৮ ফেব্রুয়ারি) : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোর জবরদস্তি নয়। আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।

বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি-দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সারা দেশে জুয়া ও মাদক বিস্তারের অন্যতম কারণ আইনশৃঙ্খলার অবনতি। সুতরাং জুয়া এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে সব রকমের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার।

বক্তব্যের শুরুতে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় এবং গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই যাত্রালগ্নে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক অভিনন্দন জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘হাজারও প্রাণের বিনিময়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পেরেছি। তাঁবেদার মুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দেশে স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের কারণেই দেশে আবার মানুষের অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’

দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি একটি বার্তা দিতে চাই, মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান তথা দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এই দেশকে আমরা একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।’
রমজানকে মুনাফা লাভের মাসে পরিণত না করার আহ্বান

রামজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই মাসকে মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত না করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসীকে রমজানের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। আমরা যদি আত্মশুদ্ধি শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করি, তাহলে এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। যদিও আমাদের অনেকের মধ্যেই এই মাসটিকে ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।’

তারেক রহমান বলেন, হাজারও প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সবক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর, ইনশাআল্লাহ।

ক্রেতা-বিক্রেতা-গ্রহীতা, এই সরকারের শক্তি বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ক্ষুদ্র মাঝারি কিংবা ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীর প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ এবং স্পষ্ট। সরকার ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা, উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়। সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে, এই ব্যাপারে আপনাদের যেকোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত। আপনারাই ভোটের মাধ্যমে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। এই সরকার আপনাদেরই সরকার।

নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশ 

রমজান মাসে বিশেষ করে ইফতার তারাবি সাহরি, এই সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় অফিস আদালতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস বিদ্যুৎ পানি খরচের ব্যাপারে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রসাধন প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।
বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানানোর আগে আমি সরকারের মন্ত্রী এবং বিএনপির এমপিদেরকে দিয়েই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। আমি বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শ অনুসরণ করবে। আমি মনে করি, বিএনপির সংসদীয় দলের এইসব সিদ্ধান্ত ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শেরই প্রতিফলন।

রেল যোগাযোগ ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ তার নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসা বাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে সঠিক সময়ে অফিস আদালত ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল, নৌ-সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থার সহজ সুলভ এবং নিরাপদ করা গেলে একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে অপরদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।

তিনি বলেন, ‘বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যানজট প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন। হাটে মাঠে ঘাটে অফিস আদালতে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না।’

যুবশক্তিকে সব রকমের সহযোগিতা করবে সরকার 

তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমাদের চারপাশে সমস্যার শেষ নেই। তবে সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও কিন্তু কম নয়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা দক্ষজনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের ‘জনসম্পদ’। আমরা নিজেদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্ব বাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত।’’

সরকারপ্রধান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং সচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধায় জ্ঞানে-বিজ্ঞানে নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যত রকমের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সব রকমের সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।

সরকারের প্রতি সবার অধিকার সমান

দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর আমি বলেছিলাম, দেশ এবং জনগণের জন্য ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে আমার ‘প্ল্যান পরিকল্পনা’র অনেক কিছুই আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম। আপনারা স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ। অঙ্গীকার পূরণের এই যাত্রাপথে আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দলমত ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান।’

মনোয়ারুল হক/  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ