নাগরিক শোকসভায় গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা
বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৬ জানুয়ারি) : বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বহুদলীয় ব্যবস্থা সুসংহতকরণ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব, ত্যাগ ও সংগ্রামকে স্মরণ করে রাজধানীতে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শুক্রবার বিকেলে পূর্বনির্ধারিত এই শোকসভায় অংশ নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং দলের শীর্ষ নেতারা।
তারেক রহমান সভাস্থলে পৌঁছানোর পর বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শোকসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শোকগাথা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন।
নাগরিক উদ্যোগে ব্যতিক্রমী আয়োজন
এই শোকসভাকে কোনো দলীয় কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আয়োজকেরা জানান, শোকসভায় কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা মঞ্চে বক্তব্য দেবেন না। পরিবর্তে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা খালেদা জিয়ার জীবন ও অবদান নিয়ে বক্তব্য রাখবেন।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে বেগম খালেদা জিয়াকে একজন সংগ্রামী নারী নেত্রী এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি
শোকসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দুপুরের পর থেকেই আমন্ত্রিত অতিথিরা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আসতে শুরু করেন।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য আগে থেকেই নির্ধারিত অতিথিদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে আমন্ত্রণপত্র ছাড়া কাউকে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
নাগরিক শোকসভা ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা জুড়ে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
শোকসভাস্থলে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। অনুষ্ঠানের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
খালেদা জিয়া: সংগ্রামী জীবনের সংক্ষিপ্ত আলেখ্য
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে তিনি দলকে সংগঠিত করেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন, সংসদীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে তাঁর ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শ্রদ্ধা ও মূল্যায়নের আহ্বান
শোকসভায় বক্তারা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নন; তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, ত্যাগ ও আন্দোলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গবেষণা ও মূল্যায়নের বিষয় হয়ে থাকবে।
নাগরিক শোকসভা থেকে তাঁর অবদানকে ইতিহাসের নিরপেক্ষ আলোকে মূল্যায়ন এবং গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এর পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে জিয়া উদ্যানে দাফন করা হয়।
মনোয়ারুল হক/
