নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দরের ‘পুনরুদ্ধার’চান বিজেপির এমপি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৭ নভেম্বর): পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (পিওকে) পাশাপাশি বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেট অঞ্চলও পুনরায় ভারতের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার সময় উপস্থিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির লোকসভা সদস্য নিশিকান্ত দুবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু পিওকে-র পাশাপাশি নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল পাকিস্তানের নিকট ‘জোরপূর্বক হস্তান্তর’ করেছিলেন। দুবের আরও দাবি, এই তিনটি ভূখণ্ড একসময়ে ত্রিপুরার (টিপরা) রাজ্যের অংশবিশেষ ছিল।

শুক্রবার ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে বলেন, “এখন শুধু পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের কবল থেকে উদ্ধার করাই নয়, বরং নেহেরুজি যে অঞ্চলগুলো জোরপূর্বক হস্তান্তর করেছিলেন—সেটি নোয়াখালী হোক, চট্টগ্রাম বন্দর হোক কিংবা সিলেট—সেগুলোও ফিরিয়ে আনার উপযুক্ত সময় এসেছে।”

সেকালে ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম সিং নিজের রাজ্য নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে প্রশ্ন করেছিলেন উল্লেখ করে নিশিকান্ত দুবে জানান, “নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দর—এই তিনটি অংশই ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীনকালে ত্রিপুরা ‘টিপরা’ নামে পরিচিত ছিল। এর রাজা বীর বিক্রম সিং ক্রমাগত নেহেরুর সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন এবং প্রশ্ন তোলেন যে, তিনি কীভাবে তার রাজ্য সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন: আপনি কীভাবে নোয়াখালীকে পাকিস্তানের হাতে অর্পণ করতে পারেন? কীভাবে সিলেটে গণভোটের আয়োজন করতে পারেন? কীভাবে চট্টগ্রামে গণভোট করতে পারেন? এটি সম্পূর্ণ আমার রাজ্য। একমাত্র আমিই সিদ্ধান্ত নেব যে এটি ভারতের অঙ্গীভূত থাকবে, পাকিস্তানের অংশ হবে, নাকি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পরবর্তীতে সর্দার প্যাটেল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ত্রিপুরা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। মহারানি কাঞ্চন প্রভা ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’ বা ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমেই ত্রিপুরা ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।”

দুবে অভিযোগ করেন যে, ১৯৪৭ সালে নোয়াখালীতে হিন্দুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার পরিবর্তে পণ্ডিত নেহেরু মুসলিম লীগকে নিজেদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু প্রাণ হারিয়েছিলেন।

“নেহেরুজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করলেও তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হননি। মূলত তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর; কারণ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই মুসলিম লীগ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করে,” বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর নোয়াখালিতে—যা একটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ছিল—হিন্দুদের ওপর পৈশাচিক গণহত্যা চালানো হয়। কেবল একদিনের ব্যবধানে প্রায় ১০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সেখানে উপস্থিত হননি; বরং তিনি এই চিন্তাতেই মগ্ন ছিলেন যে, কীভাবে মুসলিম লীগকে তার সরকারের অংশীদার করা যায়।”

দুবে আরও মন্তব্য করেন যে, চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ফলেই সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সামগ্রিক উন্নয়ন থমকে গিয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মূলত চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হওয়ার কারণে পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আজ যদি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া অঞ্চল মনে হয়, সেখানে যদি নানা জটিলতা বিদ্যমান থাকে, আমরা যদি সেখানকার খনিজ সম্পদ ও গ্যাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হই এবং অঞ্চলটিকে যদি এখনও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়—তবে তার একক কারণ হলো, সেই বন্দরটি বর্তমানে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এখন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী এবং সিলেটকে পুনরায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে।”

সিলেটে গণভোট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহারুল ইসলামকে কংগ্রেস পরবর্তী সময়ে রাজ্যসভার সদস্য করেছিল উল্লেখ করে দুবের প্রশ্ন, “নেহেরুজি যেকোনো উপায়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ত্রিপুরার রাজা বা মহারানি যখন ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরায় দীর্ঘ এক বছর ধরে সংগ্রাম চলে—তখন আপনারা কীভাবে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সিলেটের মতো হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে পাকিস্তানের হাতে (বর্তমান বাংলাদেশ) তুলে দিলেন? আপনাদের এই অধিকার কে প্রদান করেছিল?”

তিনি আরও বলেন, “যিনি সিলেটে গণভোট পরিচালনা করেছিলেন—সেই বাহারুল ইসলামের কথা কি আপনাদের জানা আছে? কংগ্রেস তাকে রাজ্যসভার সদস্য করেছিল। রাজ্যসভা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। হাইকোর্টের বিচারক পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হন। সুপ্রিম কোর্ট থেকেও অবসর নেওয়ার পর কংগ্রেস তাকে পুনরায় রাজ্যসভার সদস্য পদে ভূষিত করে।”

বাহারুল ইসলাম ‘মুসলিম লিগ রেড আর্মি’-এর সদস্য ছিলেন বলেও অভিযোগ তোলেন নিশিকান্ত দুবে। তার ভাষ্যমতে, এই বাহিনী নোয়াখালীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল এবং চট্টগ্রাম দখল করা ও সিলেটে গণভোট (রেফারেন্ডাম) আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

“ইতিহাস সংশোধন করার সময় এখন উপস্থিত হয়েছে। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর যেমন পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তা পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে, ঠিক তেমনি চট্টগ্রাম বন্দর, সিলেট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নোয়াখালীকে পুনরুদ্ধার করার সময়ও এসে গেছে,” এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল ‘টিপরা মোথা’-র প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা অভিযোগ করেছেন যে, “দেশভাগের সময় আমার ঠাকুমাকে অন্ধকারে রেখে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের একটি বিশাল অংশ পূর্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল—এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকারতম অধ্যায়।”

ত্রিপুরার রাজপরিবারের প্রধান ও আলংকারিক রাজা মাণিক্য বলেন, “আজ যদি আমাদের সমুদ্রপথে যাতায়াতের সুবিধা থাকত, তবে ‘চিকেনস নেক’ (শিলিগুড়ি করিডোর) নিয়ে আমাদের মনে কোনো উদ্বেগ থাকত না। তৎকালীন ভারত সরকারের এই কৌশলগত ত্রুটি কেবল ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলেরই নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য এক বিশাল ক্ষতি ডেকে এনেছে। আমাদের ‘গ্রেটার টিপরাল্যান্ড’ আন্দোলনকে প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, অথচ এর মূল উদ্দেশ্য সর্বদা অতীতের ঐতিহাসিক ভুলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঞ্চলগুলোকে পুনরায় একত্রিত করা।”

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ