৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণ

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৭ নভেম্বর): ৭ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। জন্ম নেয় এক নতুন বাংলাদেশ। অনেকে একে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় হিসেবে চিহ্নিত করেন। আবার কেউ কেউ একে রাষ্ট্রের স্বাধীন সত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে একটি সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকেন। তবে অর্ধশতাব্দী আগের এই দিনটিতেই বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যমণিতে আবির্ভূত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। যিনি ছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীর যোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের প্রধান এবং স্বাধীনতার মহান ঘোষক।

৭ই নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল একটি দিন। চেতনায় ভাস্বর এই দিনটি দেশে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। মূলত ৭ নভেম্বরের মাধ্যমেই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথরেখা নির্ধারিত হয়েছিল। সামরিক বাহিনীর ভেতরের অস্থিরতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় চেইন অব কমান্ড। তবে স্থিতিশীলতার এই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে বাংলাদেশকে এক অত্যন্ত সংকটময় সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সশস্ত্র বাহিনীর ভেতর ঘটতে থাকে একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান। আর এই সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ষড়যন্ত্রও মোকাবিলা করতে হয়েছিল দেশকে।

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৭৫ সালের বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্মান্তিক ধারাবাহিক ঘটনার শেষ পর্যায় ছিল এই ৭ই নভেম্বর। ওই বছরেরই ১৫ই আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে গুম-খুন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনাচার ও লুটপাট রোধে ব্যর্থতা এবং গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় শাসন কায়েমের অভিযোগ এনে ওই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর কিছু বিদ্রোহী মুক্তিযোদ্ধা মেজর।

সেনাবাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর তারই বাকশাল সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে নতুন রাষ্ট্রপতি বলে ঘোষণা করেন। তার সঙ্গে হাত মেলান সদ্য বিদায়ী সরকারের ২৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে ২১ জন। পাশাপাশি তার সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খোন্দকার এবং বিডিআর প্রধান খলিলুর রহমান। এমনকি রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর প্রধানরাও নতুন সরকারের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন।

এদিকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠেন অভ্যুত্থানকারী সামরিক কর্মকর্তারা। তারা বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে দিকনির্দেশনা দিতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে সেনাবাহিনীর প্রবীণ কর্মকর্তাদের মনে একধরনের সুপ্ত ক্ষোভ জমতে থাকে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর জেনারেল (অব.) ওসমানীকে করা হয় রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। এছাড়া তিন বাহিনীর ভেতর সমন্বয় সাধনের জন্য বাহিনী প্রধানদের ওপরে ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’ নামে একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান বিডিআর মহাপরিচালক খলিলুর রহমান। বাহিনী প্রধানদের সবসময় চাপে রাখতেই রাষ্ট্রপতি মোশতাক অত্যন্ত সুচতুরভাবে এই কৌশল নিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি বঙ্গভবনে অবস্থানরত ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী মেজর ফারুক ও রশীদের শক্তি প্রদর্শন তো অব্যাহত ছিলই।

সব মিলিয়ে সে সময় দেশে এক ধরনের অস্থিতিশীল ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এমন এক পটভূমিতেই আগমন ঘটে নভেম্বর মাসের। এই মাসের ঘটনাবলীর মূল অনুঘটক ছিলেন তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা—সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল তাহের। এদের মধ্যে সাধারণ মানুষ ও সেনাসদস্যদের কাছে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বর হামলার মুখে যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামে নিজ সামরিক ইউনিট নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জিয়াউর রহমান। এছাড়া চট্টগ্রামের অস্থায়ী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি দেশবাসীর আস্থার মূর্ত প্রতীকে পরিণত হন।

মেজর জেনারেল জিয়া সেনাপ্রধান হওয়ার পর খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীতে নিজের অবস্থান নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী তার ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এ সময় চারদিকে নানা গুজবের ডালপালা ছড়াতে থাকে। সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। সেনানিবাসের ভেতরেও বিরাজ করছিল তীব্র অস্থিরতা।

এই পরিস্থিতিতে ২ নভেম্বর রাতে ঢাকার ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়েত জামিলকে সঙ্গে নিয়ে সেনানিবাসে অভ্যুত্থান ঘটান সিজিএস খালেদ মোশাররফ। প্রথমে ২৮ অক্টোবর অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হলেও পরে তারিখ পরিবর্তন করা হয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা থেকেই খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ২ নভেম্বর রাতেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সস্ত্রীক গৃহবন্দি করা হয় এবং তার ওপর জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছুই দ্রুত এগোচ্ছিল। ৩ নভেম্বর ভোরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সমর্থনে ঢাকার আকাশে যুদ্ধবিমান মহড়াও দেয়।

পরে জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় খালেদ মোশাররফের সঙ্গে এক আপস সমঝোতার মাধ্যমে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত রশিদ, ফারুক ও ডালিমসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে বিমানে করে ব্যাংকক চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ তার ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তারা ঢাকার একটি বিশেষ ফ্লাইটে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

এদিকে ৩ নভেম্বর আরেকটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে, যা ইতিহাসে ‘জেলহত্যা’ নামে পরিচিত। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং এম মনসুর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর থেকে তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই বন্দি ছিলেন। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের আবহাওয়ার মধ্যেই ৩ নভেম্বর রাতে রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমেদ ও মেজর রশিদ-ফারুকের নির্দেশে জেলের ভেতরেই প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সারের ট্যাংক রেজিমেন্টের কিছু সৈনিক ওই চার জাতীয় নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন বলে মেজর মইনুল হোসেন বীর বিক্রম তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

৪ নভেম্বর নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদ মোশাররফ। তিনি মূলত ভারতপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওই দিনই ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়, যেখানে খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ এবং তাদের মা অংশ নেন। এই দৃশ্য দেখে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ এবং দেশের সাধারণ মানুষের একটি পক্ষ মনে করতে শুরু করে যে এই অভ্যুত্থানটি মূলত আওয়ামী লীগ ও ভারতপন্থিদের স্বার্থেই হয়েছে। ৪ নভেম্বর রাতেই খন্দকার মোশতাক পদত্যাগ করেন এবং তাকেও সেদিন গৃহবন্দি করা হয়।

সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। তাই তাকে গৃহ অন্তরীণ করে খালেদ মোশাররফের সেনাপ্রধান হওয়ার বিষয়টি অনেকের মধ্যেই তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ক্ষুব্ধ সেনাসদস্যদেরই একটি অংশ ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বসে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহেরের অনুসারী গোপন সংগঠন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার’ সদস্যরা। এই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময় নবম সেক্টরের অধিনায়ক মেজর জলিলের অনুগতদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক দল জাসদে যোগ দেওয়ার পর মেজর জলিল কর্নল তাহেরকেই সেনাসদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার মূল দায়িত্ব দেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ভেতরে তখন থেকেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল। কর্নেল তাহের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রথাগত সেনাবাহিনীর পরিবর্তে গণচীনের আদলে একটি বিপ্লবী গণবাহিনী গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালান।

জিয়াউর রহমানের বিশাল জনপ্রিয়তাকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে নিজে ক্ষমতায় বসার স্বপ্ন নিয়েই মূলত ৭ নভেম্বরের পটভূমিতে আবির্ভূত হন তাহের। তিনি জিয়াউর রহমানকে তার রাজনৈতিক কৌশলের ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা সেনাবাহিনীর ভেতর বিভিন্ন লিফলেট বিলি করে সাধারণ সিপাহিদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি সামরিক বাহিনীকে অফিসারশূন্য করে ফেলার মতো ভ্রান্ত ও উগ্র প্রচারণাও চালানো হয়। সে সময় তাদের কণ্ঠে কিছু স্লোগান বেশ জোরালো হয়ে উঠেছিল, যেমন—

“সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই”,

“সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, সুবেদারের ওপরে অফিসার নাই”।

তবে কর্নেল তাহের সম্ভবত জেনারেল জিয়ার সুদৃঢ় জনপ্রিয়তা অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। জেনারেল জিয়ার প্রতি অনুগত সেনাদল এবং দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানরা লে. কর্নেল (অব.) তাহেরের এই রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আগেই আঁচ করতে পেরে অত্যন্ত গোপনে নিজস্ব একটি পাল্টা ও অগ্রিম পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেন। সেই গোপন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত অর্থাৎ ৭ নভেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে—জাসদের অভ্যুত্থান শুরুর ঠিক ১ ঘণ্টা আগেই—দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির জওয়ানরা মেজর মহিউদ্দিন ও সুবেদার মেজর আনিসুল হকের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে উপস্থিত হন এবং তাকে মুক্ত করে কাঁধে করে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসেন।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে হাজির হন কর্নেল তাহের। তিনি জিয়াউর রহমানকে জোর করে সেনানিবাসের বাইরে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি। তাহেরের পরিকল্পনা ছিল জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর কোনো রাষ্ট্রীয় ঘোষণা দেওয়া। এরই অংশ হিসেবে তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা বেশ কয়েকজন সেনাকর্তাকে নির্বিচারে হত্যা করে। তবে জিয়াউর রহমান তাহেরের সঙ্গে সেনানিবাসের বাইরে না গিয়ে বরং সেনাবাহিনীতে অবিলম্বে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে সর্বাত্মক মনোনিবেশ করেন।

মূলত ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী পূর্বপরিকল্পনা ছিল না, এমনকি এর কোনো পূর্বনির্ধারিত একক নেতའও ছিলেন না। জনপ্রিয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে ক্ষমতা দখল করার খালেদ মোশাররফের অভিপ্রায়ই মূলত তাৎক্ষণিক সিপাহি বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল। সামরিক বাহিনীর ভেতরের পুঞ্জীভূত অস্থিরতাও এই বিপ্লবের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এই পুরো পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানকে উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে তার দল জাসদের রাজনৈতিক দর্শন ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ অলীক স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভোর ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খালেদ মোশাররফ কিংবা কর্নেল তাহের—কেউই নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারেননি। নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও বিপুল জনপ্রিয়তার জোরে জিয়াউর রহমান এই দুজনকে ছাড়িয়ে যান। ঘটনার শেষ পর্যায়ে জিয়াউর রহমান একক নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং সবকিছু দ্রুত তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

প্রয়োজনের মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অত্যন্ত দ্রুত ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন জেনারেল জিয়া। একাত্তরের ২৬ মার্চ তিনি ঠিক এমনই এক দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেদিন তার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে হতবিহবল জাতি যেন নতুন করে সম্বিত ফিরে পেয়েছিল। তিনি ছিলেন অমিত সম্ভাবনাময় ও সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং আইন মেনে চলা একজন অনুগত সৈনিক। এই অনন্য গুণগুলোই জিয়াউর রহমানকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীকে পরিণত হন। জেনারেল জিয়ার পক্ষ নিয়েই সেদিন সামরিক বাহিনীর জওয়ান ও আপামর জনসাধারণ দলে দলে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সিপাহি-জনতার এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের মূল অনুপ্রেরণা।

তাই ৭ নভেম্বর নিছক অতীতের কোনো সাধারণ অভ্যুত্থান কিংবা কেবল ক্ষমতার পালাবদলের দিন নয়; এটি ছিল এক গভীর অনিশ্চয়তা, বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলায় বিপর্যস্ত রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ধারাবাহিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী বিভাজনে যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামরিক শৃঙ্খলা এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছিল, ঠিক তখনই ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। জিয়াউর রহমানের মুক্তি, তাঁর হাত ধরে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জোরালো উদ্যোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বহুমুখী প্রচেষ্টা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কেবল সামরিক বাহিনীই নয়, দেশের প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক সমাজজীবনেও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়াউর রহমানের পরিচিতি, সশস্ত্র বাহিনীতে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং গভীর সংকটকালে নেতৃত্ব দেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা তাঁকে অচিরেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, সামরিক শৃঙ্খলা, জাতীয় সংহতি এবং রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের প্রভাব কোনোভাবেই অস্বীকার করার জো নেই। কারণ, সেদিনের ঘটনাবলি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবদলই ঘটায়নি, বরং একটি গভীর সংকটাপন্ন রাষ্ট্রকে নতুন করে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে ওঠার সঠিক পথও তৈরি করে দিয়েছিল। তাই ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি স্মরণীয় তারিখই নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। আর এই পুরো অধ্যায়ের মূল চালিকাশক্তি ও নায়ক ছিলেন কেবলই জেনারেল জিয়াউর রহমান। সূত্র: বাসস

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ