ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব শুরু
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৬ অক্টোবর): ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার বর্ণাঢ্য আয়োজনে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ঢাকে ও কাঁসরের আওয়াজ, ধূপ-আগরবাতির সুবাস এবং শঙ্খধ্বনিতে এক মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দেবী দুর্গার আগমনী সুরের সঙ্গে ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো মণ্ডপ প্রাঙ্গণ।
মণ্ডপের একপ্রান্তে চলছে ভক্তিভরে ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন, অন্যপ্রান্তে জ্বলছে প্রদীপ ও মোমবাতির আলো। বাহারি ও আকর্ষণীয় আলোকসজ্জায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে দেবী দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমাগুলো। ছোট থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ—সব বয়সের পুণ্যার্থীই প্রতিমার সামনে হাজির হচ্ছেন। খালি পায়ে করজোড়ে দেব-দেবীকে প্রণাম জানানোর পাশাপাশি অনেকে মনের গোপন আকুতি জানাচ্ছেন দেবীর চরণে, আবার কেউ কেউ মায়ের প্রতিমার সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হচ্ছেন সেলফিতে। আজ রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে এমনই প্রাণবন্ত দৃশ্য চোখে পড়েছে।
আগামীকাল শনিবার ও রোববার জুড়ে পালিত হবে মহাসপ্তমী। বাংলা পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী এবার এই দুই দিন মহাসপ্তমী তিথি থাকায় এর পরের দিন অর্থাৎ মহাঅষ্টমি থেকেই দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে যাচ্ছে। ওই দিন ভক্তরা পবিত্র উপবাস পালন করে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করবেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করবেন।
আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠী তিথিতে কল্পারম্ভের মাধ্যমে বেলতলায় ঘট স্থাপন করে দশভুজা দেবী দুর্গাকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মধ্য দিয়েই মূলত শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। প্রতিমাগুলোতে দেবী দুর্গার পাশাপাশি অধিষ্ঠান করেছেন দেবী লক্ষ্মী, দেবতা গণেশ, কার্তিক ও সরস্বতী।
বর্তমানে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার। আগামী চার দিনজুড়ে পূজা-অর্চনা, ভক্তিমূলক গানের আসর, প্রসাদ বিতরণ ও আরতি প্রতিযোগিতা সহ নানা উৎসবমুখর আয়োজনে মেতে থাকবেন তারা।
রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদ মণ্ডপসহ পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও লালবাগ ঋষিপাড়া মন্দিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব পালিত হচ্ছে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত বরুন চক্রবর্তী জানান, মহাষষ্ঠীর সকালে কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন করার সংকল্প করা হয়। ভক্তরা মনে করেন দেবী বিল্ববৃক্ষে আগমন করেছেন এবং তাঁর সেই রূপের পূজা করাকেই কল্পারম্ভ বলা হয়। এছাড়া সন্ধ্যায় বোধন ও অধিবাসের মাধ্যমে দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর সারা দেশে মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে উন্নীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অনুদান ৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
পঞ্জিকা অনুসারে, জগতের সার্বিক মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যধামে আগমন করেছেন এবং বিদায়ের সময় নৌকায় চড়ে পুনরায় স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশেষ দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। এর ফলে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বমোট পাঁচ দিনের ছুটি উপভোগ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বাসসকে জানান, এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। এমন সুন্দর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
দুর্গাপূজা কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষকেও একই সুতোয় বেঁধে ফেলে, যা দেশের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আবহমান ঐতিহ্যকেই উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলে।
মনোয়ারুল হক/
