প্রাথমিকের শিক্ষক প্রশিক্ষণ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৪ অক্টোবর): দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বহুগুণ বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মেয়াদ আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত করার কথা ভাবছে নীতিনির্ধারক মহল। এর পাশাপাশি, প্রতিটি প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় ছয় গুণ বাড়িয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব কথা জানান।

উক্ত সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক গুণগত অগ্রগতি, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জট নিরসন, ক্লাসরুমে তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, দেশব্যাপী ‘মিড-ডে মিল’ চালুর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এবং কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর জন্য তদারকি নীতির মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।

নতুন শিক্ষক প্রশিক্ষণ ফ্রেমওয়ার্ক ও পিটিআই সক্ষমতা বৃদ্ধি

দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষকরা অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় ক্লাসরুমে পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার যে প্রচলিত ধারা চলে আসছে, তাতে একটি সুদূরপ্রসারী নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিক্ষকদের আধুনিক ও যুগোপযোগী শিখনপদ্ধতিতে পুরোপুরি পারদর্শী করে তুলতে নতুন একটি প্রশিক্ষণ ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে মাত্র দুই মাসের ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ নিয়েই নিজ নিজ ক্লাসে ফিরে যাবেন। এরপর নির্ধারিত সিলেবাস বা মডিউল অনুসরণ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে) বাকি প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষাগুলো তারা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করবেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ইতোমধ্যে এক বছর মেয়াদী একটি নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল চূড়ান্ত করেছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের সাম্প্রতিক ব্যাচগুলো এই নতুন মডিউলের আওতায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাসের ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ শেষ করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অংশ নেবেন এবং বাকি ১০ মাসের প্রশিক্ষণ অনলাইন ও অফলাইনের সমন্বয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করবেন।

বর্তমানে পিটিআইগুলোর বার্ষিক প্রশিক্ষণ সক্ষমতা প্রায় সাত হাজারের কাছাকাছি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সক্ষমতাকে একলাফে ৪২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এজন্য কেবল পিটিআইগুলোর ওপর নির্ভর না করে, প্রয়োজনে দেশের স্বনামধন্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন ডিপার্টমেন্টগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে কিন্ডারগার্টেন এবং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, ‘নীতিগতভাবে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে কোনো শিক্ষক ক্লাসরুমে স্থায়ীভাবে পাঠদান চালিয়ে যেতে পারবেন না।’

আগামী বছরের মধ্যেই দেশব্যাপী ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি

স্কুলে শিশুদের উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী করা এবং তাদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ‘মিড-ডে মিল’ প্রকল্প। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের দেড়শ উপজেলায় মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু রয়েছে এবং বাকি উপজেলাগুলোতে এর আওতা সম্প্রসারণের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির কাজও এগিয়ে চলেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও ডিজিটাল ইকোসিস্টেম

শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ গড়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ ডিভাইস বিতরণের প্রকল্প নয় বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গুগলের মতো বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা ক্লাসরুমের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছি। আর এই পুরো সিস্টেমের মূল কানেক্টর বা সংযোগকারী হিসেবে শিক্ষকদের হাতে বিশেষ ট্যাব পৌঁছে দেওয়া হবে।’

তাছাড়া দেশের যে সমস্ত দুর্গম অঞ্চলে এখনও বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছায়নি, সেসব এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যৌথ সমঝোতার ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপন ও পর্যাপ্ত ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নিশ্চিতকরণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ

সারাদেশে প্রধান শিক্ষকের প্রায় প্রায় ছত্রিশ হাজার নয়শো ষাটটি শূন্য পদ পূরণের বিষয়ে আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার অপেক্ষা চলছে। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাথে আমাদের আগেই আলোচনা হয়েছে। রায়ের কপি হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই পদোন্নতি কার্যক্রম দ্রুত গতিতে শুরু হবে। এটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে নতুন শিক্ষক নিয়োগের পথও সুগম হবে এবং তখন বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।’

শিশুদের ওপর থেকে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা কমিয়ে আনন্দদায়ক ও সৃজনশীল উপায়ে শিক্ষা প্রদান, গল্প বলার মাধ্যমে শেখানো এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পাশাপাশি হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের কাজ করতে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ আর্থিক ভাতা প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের দীর্ঘ কষ্ট দূর করতে প্রয়োজনে আবাসিক বা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও সরকারের নীতিগত বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

সূত্র: বাসস

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ