প্রবাসীদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৩ অক্টোবর): প্রবাসীরা বিদেশ থেকে কষ্টার্জিত অর্থ পাঠিয়ে দেশে সম্পত্তি কেনা কিংবা পরিবারের কাছে পাঠানো টাকা ফেরত চাওয়ার মতো বিষয়ে বছরের পর বছর যে আইনি জটিলতা ও হয়রানির শিকার হন, তা দূর করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই দীর্ঘসূত্রিতা ও ভোগান্তি কমাতে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় সদরে প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, এই আদালতগুলো কেবল প্রবাসী নাগরিকদের মামলাগুলো দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই কাজ করবে। বর্তমানে এই প্রস্তাবটির খসড়া তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
আজ রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তিন দশকপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘সোনার মানুষ সম্মিলন-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেন অভিবাসী শ্রমিকরা। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি খাত, হিমায়িত চিংড়ি, পাট ও চা রপ্তানির পাশাপাশি বর্তমান সময়ে শ্রম রপ্তানিও দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। সময়ের বিবর্তনে কায়িক শ্রমের পরিধি পেরিয়ে এখন বুদ্ধিবৃত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রও প্রসারিত হচ্ছে। দেশের ভেতরে প্রবাসী শ্রমিকরা আইনি জটিলতায় পড়লে লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে একটি ডেডিকেটেড হটলাইন চালু করা হয়েছে, যেখানে যুগ্ম জেলা জজ মর্যাদার লিগ্যাল এইড অফিসারদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
সম্প্রতি নিজের দুবাই সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, সেখানকার প্রবাসী শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবন অত্যন্ত দুর্বিষহ ও সংগ্রামের। সকালের প্রাতঃভ্রমণ ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে দুই ঘণ্টা আগে যাত্রা শুরু করা এবং রাত ৮-৯টার দিকে কর্মস্থল থেকে ফিরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের রান্নাবান্না করার মতো কঠোর রুটিনের মধ্য দিয়ে তাদের দিন কাটে। এই অমানবিক শ্রমের পরেও অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় বাংলাদেশি কর্মীরা অনেক কম পারিশ্রমিক পান। এই বৈষম্যমূলক বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করার জন্য তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।
প্রবাসীদের বহুমুখী সংকটের জন্য অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করে আইনমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং আরও বহু ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এর নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে এমন সব ভুয়া সার্টিফিকেট ও ভুয়া কাগজপত্র জমা দিচ্ছে যার বাস্তব কোনো ভিত্তি বা অস্তিত্বই নেই। বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কল্যাণে খুব সহজেই এসব নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে।
রামরুর তিন দশকের পথচলাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, রামরু ও এর পুরো টিম শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কখনোই যুক্ত ছিল না। শ্রমিকদের নামে অর্থ এনে তহবিল তছরুপের মতো কোনো নেতিবাচক অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে ওঠেনি। রামরুর চিন্তাধারার স্বচ্ছতার ভেতর কোনো ধরনের কলুষতা আমরা লক্ষ্য করিনি এবং এই প্রতিষ্ঠানটিকে কখনো রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে জড়াতে দেখা যায়নি।’
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই ৩০ বছরের সফল অভিযাত্রা একসময় শতবর্ষে পদার্পণ করবে এবং অদূর ভবিষ্যতে এমন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে যেখানে প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে না গিয়ে দেশেই সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন এবং বাংলাদেশ নিজেই অন্যান্য দেশ থেকে কর্মী গ্রহণ করবে।
মনোয়ারুল হক/
