অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৩ অক্টোবর): সামষ্টিক অর্থনীতিতে সুস্থিতি আনার কৌশলগুলোর পেছনে ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের নোবেল স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন রবার্ট ই. হল এবং মাইকেল উডফোর্ড।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে।
তাদের এই নতুন সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপরেখা যুগোপযোগী ও কার্যকর স্থিতিশীলতা নীতি তৈরি এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ফ্রেমওয়ার্কগুলোর ওপর ভিত্তি করে সময়োচিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চক্রাকার ওঠানামা অনেকাংশে প্রশমিত করা সম্ভব।
অর্থনীতির অন্যতম স্থায়ী চরিত্র হলো এর ওঠানামামূলক বা পর্যায়ক্রমিক গতিপ্রকৃতি। প্রায় একশ বছর আগে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্ব পেশ করার পর থেকেই অর্থনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে স্থিতিশীলতামূলক নীতি অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দার সময় সুদের হার কমিয়ে আনা এবং সরকারি বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর পথ ধরে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা হয়ে থাকে।
বিপরীতে, অর্থনীতি যখন অতিরিক্ত চাঙ্গা হয়ে ওঠে, তখন এর মাত্রাতিরিক্ত গতি রোধ করতে এর ঠিক উল্টো পদক্ষেপগুলোই গ্রহণ করতে হয়।
কিন্তু সত্তরের দশকের জ্বালানি সংকটের কালে কেইনসীয় মডেলগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। ঠিক কখন এবং কোন উপায়ে নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিরূপণে এই মডেলগুলো আর আশানুরূপ ফলাফল দিতে পারছিল না। বেকারত্ব হ্রাসের বদলে উল্টো অনেক সময় অর্থনীতি মারাত্মক মূল্যস্ফীতির মুখে পড়ে। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘ প্রায় এক দশকজুড়ে কম প্রবৃদ্ধি, তীব্র বেকারত্ব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো জটিল অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়।
এমন এক পরিস্থিতিতে বহু অর্থনীতিবিদই এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, স্থিতিশীলতা নীতিগুলো উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং এগুলো বর্জন করা উচিত।
এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, স্থিতিশীলতা নীতিকে অধিকতর কার্যকর করে তোলার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক মডেলসমূহকে কীভাবে নতুন রূপ দেওয়া সম্ভব, তা সফলভাবে দেখানোর স্বীকৃতি হিসেবেই এবার রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার প্রদান করা হলো।
মুদ্রাস্ফীতি, উৎপাদন কিংবা ভোগের মতো প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চলকগুলোর মধ্যকার গতানুগতিক পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর না করে, তারা এসব মডেলকে সুদৃঢ় ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর স্থাপন করেন।
তাদের গবেষণায় ব্যক্তিমানুষ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তসমূহ কীভাবে বৃহত্তর অর্থনীতিকে রূপ দেয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
এই তাত্ত্বিক মডেলগুলোর একটি অন্যতম বিশেষ দিক হলো, সাধারণ পরিবার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই সঞ্চয় করা, ভোগ বাড়ানো কিংবা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন তাদের ভবিষ্যৎ নীতিগত পরিকল্পনার কথা আগাম ঘোষণা করে, তখন তা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। আর এভাবেই পুরো অর্থনীতিকে একটি কাঙ্ক্ষিত ও সুশৃঙ্খল পথে পরিচালনা করা সহজ হয়।
এই উদ্ভাবনী মডেলগুলো পরবর্তীতে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে মহামন্দা মোকাবেলা, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই করার ক্ষেত্রে এগুলো নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণমূলক দক্ষতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সূত্র: নোবেল প্রাইজ
মনোয়ারুল হক/
