রংপুরে ৪ খুন: ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা, গ্রেপ্তার ২ তরুণ

প্রতিনিধি (রংপুর), এবিসিনিউজবিডি, (২৩ আগস্ট): প্রতিনিধি (রংপুর), আলোকিত সময়, (২৩ আগস্ট): গভীর রাতে ছাদ থেকে ভেসে আসছিল অস্বাভাবিক শব্দ। শব্দ শুনে বিষয়টি দেখতে ছাদে উঠেছিলেন সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। সেখানে গিয়ে তিনি পরিচিত দুই তরুণকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেন। এতে বাধা দেন তিনি। কিন্তু সেই বাধাই শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে ভয়াবহ পরিণতি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ হারান একই পরিবারের চারজন।

পুলিশ জানিয়েছে, নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ১২ বছরের শিশুসন্তানকে হত্যা করে ওই দুই তরুণ। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে লুটপাটের নাটক সাজিয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া এবং নিজেদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে ভোলা, মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) এবং জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশকে হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের গতকাল শনিবার ভোররাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন— মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তাঁরা সম্পর্কে মামাতো ভাই। মুগ্ধ নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ পিকে পাল জুয়েলার্সে প্রায় আট বছর ধরে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।

আজ রোববার বেলা পৌনে ১টার দিকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে ছাদে যান গণপতি। তাঁদের বাধা দিলে তাঁকে গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতেই তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়েকে এবং সর্বশেষ ১২ বছরের শিশু প্রিয়মকে হত্যা করা হয়। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিয়ম আসামিদের চিনত। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তাকেও হত্যা করা হয়।

পুলিশ জানায়, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই ছিল দুজন। তারা গোসল করে, খেজুর খায় এবং ইয়াবা সেবন করে। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডাকাতির ঘটনা বলে তদন্তকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করে।

পুলিশ জানায়, ঘরে পাওয়া একটি স্বর্ণের চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার আলামত থেকেই তদন্তে নতুন সূত্র মেলে। পরে সিদ্ধার্থের স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞতার বিষয়টি সামনে আসে। লুট করা স্বর্ণালংকার তাদের দেখানো মতে একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাড়ির দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা, আলামত নষ্ট করতেই এমনটি করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি ও কামড় দেওয়া শসাও উদ্ধার করা হয়েছে। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, হত্যার আগে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নগরের একটি বাসায় ইয়াবা সেবন করেছিল। পরে মাছুয়াপাড়ায় এসে আবার ইয়াবা সেবন করে। পুলিশ ইয়াবা সরবরাহকারী হিসেবে খুশি ওরফে প্রশান্তের নামও পেয়েছে। তদন্তে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ