মূল্যস্ফীতির চাপ: নীতি সুদহারে ছাড় দিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (২৪ জানুয়ারি) : দেশের মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি—এই বাস্তবতায় আসন্ন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার কমানোর পথে যাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের অক্টোবরের পর নভেম্বর ও ডিসেম্বর—টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত কড়াকড়ি নীতিতেই অটল থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জানুয়ারি থেকে জুলাই মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতিতেও সংকোচনমূলক অবস্থান বজায় থাকবে। সামনে জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও নীতিনির্ধারকদের সতর্ক অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে।
সম্প্রতি গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নীতিগত আলোচনায় নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশেই বহাল রাখার পক্ষে মত বেশি ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২২ জানুয়ারি মুদ্রানীতির কোর কমিটির বৈঠকেও একই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই মুহূর্তে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ফলে ঋণপ্রবাহ সহজ করার মতো কোনো শিথিল পদক্ষেপ আপাতত নেওয়া হচ্ছে না।
নীতিনির্ধারণী আলোচনায় আরও জানা গেছে, শুধু রেপো হার নয়—সুদের হার করিডরের অন্যান্য সূচকেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে না। স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ), স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ও ওভারনাইট রেপো হার প্রায় আগের মতোই থাকছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা স্বল্পমেয়াদি আমানতের সুদ সামান্য কমতে পারে, তবে ঋণ নেওয়ার খরচ কমার সম্ভাবনা খুবই কম।
অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমানে ডলারের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং আমদানির চাপও আগের মতো নেই। এই পরিস্থিতিতে সংকোচনমূলক নীতিতে সীমিত পরিসরে কিছুটা শিথিলতা আনা যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি যদি ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি ফিরবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো সময় লাগবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক অবস্থানকে সমর্থন করছে। অক্টোবরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.১৭ শতাংশ, নভেম্বরে তা বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ডিসেম্বরে আরও বেড়ে হয় ৮.৪৯ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের বেশি।
বর্তমান নীতির পেছনে দীর্ঘ একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার সময় রেপো হার ছিল ৮.৫০ শতাংশ। পরবর্তীতে তিন দফায় হার বাড়িয়ে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এর প্রভাবে বর্তমানে ব্যাংকঋণের গড় সুদহার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ সৃষ্টি করছে।
সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ কমছে এবং কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে এবং ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়—রাজস্ব নীতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকি একসঙ্গে কার্যকর হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, মুদ্রানীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া রয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের মতামত, বিভিন্ন সমীক্ষা ও অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকলেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
মনোয়ারুল হক/
