কমলা বাগানে স্বপ্ন বুনছেন রাসেল

নিজস্ব প্রতিবেদক (মাদারীপুর), এবিসিনিউজবিডি, (৩ ডিসেম্বর) : বাবার গড়ে তোলা শখের কমলা বাগানে স্বপ্ন বুনছেন মাদারীপুরের শিবচরের যুবক রাসেল হোসেন। পরিবারে অভাব অনটন দূর করতে রাসেল গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু প্রবাস জীবনে খুব একটা ভালো ছিলেন না। ২০২২ সালে দেশে ফিরে প্রথমে পরিবহন সেক্টরে চাকরি নেন। কিন্তু কৃষির প্রতি প্রবল ঝোঁক তাকে টেনে আনে মাটির কাছে। চাকরি ছেড়ে তিনি বাবার কমলা বাগানে মনোনিবেশ করেন। শুরু হয় নতুন করে যত্ন-পরিচর্যা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া মৃধাকান্দি এলাকায় প্রায় ছয় বছর আগে শওকত হোসেন ১ বিঘা ৩৩ শতক জমিতে ৬০টি ছোট জাতের কমলা গাছ লাগান। প্রথমদিকে ফলন আসেনি। ২০২২ সালে ছেলে রাসেল সৌদি আরব থেকে ফিরে বাগানের দায়িত্ব নেন। প্রবাস শেষে তিনি কী করবেন তা নিয়ে ছিলেন দুশ্চিন্তায়। কিছুদিন পরিবহন সেক্টরে কাজও করেন। কিন্তু কৃষির প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাকে ফিরিয়ে আনে বাগানে।

রাসেল ইন্টারনেটে কমলা চাষ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরিচর্যার নতুন ধারা আনেন। ২০২৪ সালে বাগান ভরে আসে কমলার ফুলে। পরিণত কমলা রঙিন রূপ নেয়। কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার না করায় স্বাদ হয় অতিমিষ্ট। বাজারের বিদেশি কমলার থেকে বেশি সুমিষ্ট হওয়ায় সাড়া পড়ে ক্রেতাদের মধ্যে।

গত বছর রাসেল ৮৭ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেন। আবহাওয়াজনিত কারণে চলতি বছর ফলন কিছুটা কম হলেও স্বাদ আরও বেড়েছে। তার বাগানের কমলায় এবার টকভাব কম, মিষ্টি বেশি। পাইকারি ও খুচরা- দুইভাবেই বিক্রি চলছে। তিনি জানান, বাজারে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে কমলা বিক্রি করছেন। অনেকেই বাগান থেকে সরাসরি কমলা কিনতে আসেন। কমলার পাশাপাশি মাল্টা, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলও রয়েছে।

বাগান বড় করার পরিকল্পনা থাকলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান রাসেল। সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে চাষ করতে চান তিনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে সাধারণত কমলার চাষ খুব একটা দেখা যায় না। গত বছর থেকে দত্তপাড়ার এই বাগানে প্রচুর কমলা ধরছে। স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় বাজারে চাহিদা বেশ। শিবচরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে বাগান থেকে কমলা কিনে নিচ্ছেন।

স্থানীয় সাংবাদিক মাসুম হাওলাদার বলেন, ‘বাগানটি দেখতে ও কমলা কিনতে এসেছি। কমলার পাশাপাশি মাল্টা, পেয়ারা, ড্রাগনও রয়েছে। অনেক সুন্দর বাগান। প্রতিদিন অনেক লোক কমলা কিনতে আসে। আমাদের এলাকায় যারা বেকার, তারা রাসেল ভাইয়ের সহযোগিতায় বাগান করলে নিজের ভাগ্য বদলে যাবে।’

কমলা কিনতে আসা শাহিন মিয়া নামে এক স্কুলশিক্ষক বলেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউবে কমলা চাষ দেখেছি। আজ সরাসরি বাগান দেখলাম, কমলা ছিঁড়লাম। নিজের এলাকায় এত সুন্দর কমলা হয় ভাবিনি। গাছপাকা কমলা খুব মিষ্টি। এই কমলায় কোনো ফরমালিন নেই। এ কারণে চাহিদা বেশি।’

ওবায়দুর রহমান নামে এক আয়কর কর্মকর্তা বলেন, ‘রাসেল মিয়ার মতো আমাদের সবার উদ্যোক্তা হতে হবে। যারা বেকার, কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাগান করলে বেকারত্ব দূর হবে। পাশাপাশি রাজস্বেও ভূমিকা রাখবে।’

কমলা চাষি রাসেল মিয়া বলেন, ‘মূলত বাগানটা বাবার। আমি সৌদি প্রবাসী ছিলাম। চার বছর আগে দেশে এসে পরিবহন সেক্টরে চাকরি করি। কিন্তু বাগান নিয়ে আলাদা স্বপ্ন ছিল। তাই চাকরি ছেড়ে বাগানের দায়িত্ব নিই। আমাদের বাগানে কমলা ছাড়াও মাল্টা, পেয়ারা, ড্রাগন আছে। এ ছাড়া সবজিও চাষ করি। তবে কমলার সাড়াই সবচেয়ে বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘৯ বিঘা জমিতে বাগান। এর মধ্যে দেড় বিঘায় কমলা। ৬০টি চারা লাগানো হয়েছিল। কয়েকটি মারা গেলেও বাকিগুলোতে কমলা ধরে। গত বছর প্রচুর কমলা হয়েছিল। এ বছর একটু কম। কিন্তু স্বাদ ভালো। সঠিক পরিচর্যা করলে যেকোনো ফলের বাগানে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আমরা শিবচরেই বিক্রি করি। অনলাইনেও বিক্রি হয়। দাম ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি। শুরুতে খরচ বেশি। এরপর নিয়মিত পরিচর্যা, সার ও ওষুধে খরচ হয়। ভালো ফলন হলে লাভও ভালো হয়।’

শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পরামর্শ নিয়ে তিনি স্বল্প আকারে মিশ্র ফলবাগান করেছেন। দুই বছর ধরে কমলা ফলন হচ্ছে। আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিয়মিত বাগানে গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। বাগান সম্প্রসারণে কোনো সহযোগিতা লাগলে তা করা হবে।’

সৌজন্যে: খবরের কাগজ

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ