মানিকগঞ্জে বেড়েছে কীটনাশকের ব্যবহার

নিজস্ব প্রতিবেদক (মানিকগঞ্জ), এবিসিনিউজবিডি, (৩ ডিসেম্বর) : বিশ্ব কীটনাশকমুক্ত দিবস আজ (৩ ডিসেম্বর)। কিন্তু কৃষিনির্ভর মানিকগঞ্জে এখনো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক। কৃষক, বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা বলছেন, ভুল তথ্য, ব্যবসায়ীদের বিক্রির প্রতিযোগিতা এবং সচেতনতার অভাবে জেলায় বাড়ছে কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা। প্রায় ৫ লাখ কৃষক নিয়মিত শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করছেন। অধিকাংশই জানেন না এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিংবা মাটি ও পরিবেশের ক্ষতির কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কীটনাশকের অতি ব্যবহার এখন হয়ে উঠছে নীরব সংকট।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গোলড়া গ্রামের কৃষক মনসুর হোসেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কৃষিকাজ করছেন। নিজের দেড় বিঘা জমিতে বেগুন ও শিম চাষ করেন। তিনি নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করেন। স্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা জানলেও উপায় না থাকায় এটি চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘ভালো ফলন চাইলে কীটনাশক ছাড়া উপায় নেই। গায়ে লাগে, গন্ধে মাথা ধরে, তবুও কাজ থামানো যায় না। আমার শিম খেতে সপ্তাহে তিন দিন স্প্রে করতে হয়। একবার বাদ গেলেই ফুল আর ফল ঝড়ে পড়ে। এক বিঘা জমিতে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকার মতো কীটনাশক দিতে হয়। না দিলে সবজি নষ্ট হয়ে যায়।’ তার মতো জেলায় আরও অসংখ্য কৃষক পোকা দমন ও ফলনের আশায় সপ্তাহে দু-তিনবার কীটনাশক ব্যবহার করছেন।

সদর উপজেলার বারাহিরচর গ্রামের কৃষক আলী হোসেন তিন যুগ ধরে চাষাবাদ করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে সার-কীটনাশক ছাড়া চাষ হতো। এখন নদীতে পানি আসে না, পলি পড়ে না। মাটির শক্তিও কমে গেছে। তাই ফলনের জন্য কীটনাশকই ভরসা। দোকানে গিয়ে বললে যেটা দেয়, সেটাই ব্যবহার করি। ভুল সময়ে বা বেশি স্প্রে হলে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সব ঝুঁকি আমাদেরই নিতে হয়। কত টাকা যে খরচ হয়ে যায় তার হিসাব থাকে না।’

সাটুরিয়া উপজেলার ফুকুরহাটি গ্রামের সবজি চাষি মোহাম্মদ বরকত বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে বেগুন আর শিম লাগাইছি। শুরুতে ভাবছিলাম ভালো আয় হবে। কিন্তু এখন দেখি শুধু কীটনাশকের পেছনেই সপ্তাহে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। সপ্তাহে দু-তিনবার দিতে হয়। না দিলেই পাতায় পোকা ধরে। এত খরচের পর যখন বাজারে যাই, দাম ভালো মেলে না। আমরা যেন এক অদ্ভুত চক্রে আটকে গেছি। বেশি বিষ দাও, বেশি খরচ করো, কিন্তু লাভ কমে যায়।’

কামতা গ্রামের চাষি তোরাব হোসেন বলেন, ‘এখন কীটনাশক আর সার ছাড়া কোনো ফসল চাষ হয় না। আগের দিনে অল্প খরচে ফসল হতো। এখন পোকামাকড়ের প্রকোপ বাড়ছে। বিষ না দিলে জমি দাঁড়ায় না। বাজারে গেলে ক্রেতারা বলে, দাগ থাকা চলবে না। পোকা লাগা সবজি নিতে চায় না। ভালো মানের সবজি দিতে গেলে সপ্তাহে অন্তত দুবার স্প্রে করতে হয়। মাঠে যেতেও ভয় লাগে। কিন্তু ফসল বন্ধ করলে পরিবার চলবে না। বাধ্য হয়ে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি।’

একই গ্রামের মোক্তার হোসেন বলেন, ‘বিষ না দিলে সবজি টিকিয়ে রাখা কঠিন। ভালো বেগুনের কেজি ৪০-৫০ টাকা। একটু বাকা বা পোকা লাগা হলে ১০ থেকে ১৫ টাকাও পাওয়া যায় না। টাকাই যদি না ওঠে, সংসার চলবে কী দিয়ে? তাই বাধ্য হয়ে স্প্রে করি। আমাদেরও ইচ্ছা হয় বিষ ছাড়া চাষ করতে। কিন্তু করলে ফলন কমে যায়, পোকা ধরে সবজি নষ্ট হয়। এখন কীটনাশকের দাস হয়ে গেছি। প্রতি বছরই দেখি পরিমাণ বাড়ছে, খরচ বাড়ছে, কিন্তু লাভ কমছে। তার পরও থামানোর সাহস হয় না।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের মানিকগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক বিমল রায় বলেন, ‘বেশি ফলনের আশায় প্রতিনিয়ত কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ছে। এ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত সবজি স্বাস্থ্যকর কি না, আর পরিবেশের প্রাণবৈচিত্র্য কতটা রক্ষা হচ্ছে সেটাই ভাবার বিষয়। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কীটনাশক কমাতে স্থানীয় প্রযুক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে মাটির উর্বরতা কমে যাবে, উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস হবে।’
মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. মানবেন্দ্র সরকার মানব বলেন, ‘কীটনাশকের বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, লিভারের সমস্যা, স্নায়বিক রোগ, শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাঠে যারা প্রতিদিন ব্যবহার করেন তারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে। কীটনাশকযুক্ত সবজি নিয়মিত খেলে কিডনিজনিত সমস্যা ও ক্যানসার হতে পারে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘কৃষকরা দোকান থেকে কীটনাশক কিনে মাঠে ব্যবহার করেন। অতিমাত্রায় ব্যবহার করলে ফসলের ক্ষতি হয়। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নতুন করে যাদের কীটনাশকের লাইসেন্স দেওয়া হবে তাদের এসএসসি পাস হতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে উত্তীর্ণদের লাইসেন্স দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে আমাদের কর্মকর্তাদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কীটনাশক বিক্রি করা যাবে না। আমরা আশা করি এটি বাস্তবায়ন হলে ব্যবহার কমবে। পাশাপাশি আমরা আইপিএম, ফেরোমন ট্র্যাপ ও জৈবপদ্ধতির পরামর্শ দিচ্ছি।’

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ