নেতাকর্মীদের আচরণ সংশোধনের আহ্বান স্পিকারের

ভোলা প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (২০ অক্টোবর): ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের আত্মশুদ্ধির পথে ফেরার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, সাধারণ মানুষের ওপর যেকোনো ধরনের উৎপীড়ন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও জবরদখল অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে ভোলার লালমোহন উপজেলা অডিটোরিয়ামে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) চেয়ারম্যান মনোনীত হওয়ায় আয়োজিত এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন যৌথভাবে এই সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে।

সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি সামনে এনে স্পিকার বলেন, মাদক ও অপরাধ দমনে ইশরাক হোসেনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয় ছিল। তিনি মূলত পুলিশের ওপর আক্রমণকারী কিছু মাদকসেবীকে প্রতিহত করতে ময়দানে নেমেছিলেন। তবে নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া তাঁর জন্য মোটেই শোভন হয়নি। একজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার সঙ্গে এটি খাপ খায় না। তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক বডিগার্ড ও পুলিশ ফোর্স থাকে, প্রয়োজনে দলীয় কর্মীরাও পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার হাতে আইনসম্মত হোক কিংবা অবৈধ হোক, কোনো অস্ত্রই মানানসই নয়।

স্পিকার আরও উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ঢাকার একজন নারী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে হাসপাতাল দখলের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। একইভাবে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। অতীতের কোনো রাজনৈতিক সরকারই নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

বিগত ১৭-১৮ বছরের দেশ পরিচালনার তীব্র সমালোচনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জোরপূর্বক ক্ষমতায় টিকে ছিল। সেই নির্বাচনগুলোতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। চিরকাল ক্ষমতায় থাকার অন্ধ অহংকার থেকেই দেশে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির পাহাড় গড়ে ওঠে। তাঁর অভিযোগ, দেশ ছাড়ার আগে আগের ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন এবং তাদের অনেকেই বর্তমানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকার দেশের আর্থিক খাতের দুর্নীতি দূর করতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কঠোর ও আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অতীতে ঘটে যাওয়া সমস্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িতদেরও আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা বলেন তিনি।

বাক্‌স্বাধীনতা প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, বর্তমান মুক্ত পরিবেশে সাধারণ মানুষ শুধু সরকার নয়, সরাসরি সরকারপ্রধানের কাজেরও সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এই সমালোচনা অবশ্যই গঠনমূলক ও যুক্তিসংগত হতে হবে। বিগত আওয়ামী আমলের দুঃশাসনের কালো অধ্যায় যেন এ দেশে আর কখনো ফিরে না আসে, সে বিষয়েও তিনি সতর্কবার্তা দেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রায় দুই দশকের দুঃশাসনের পর দেশের মানুষ একটি সত্যিকারের নির্বাচিত সরকার পেয়েছে। এই সরকার যেন দেশের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করতে পারে, সেজন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে। নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা তাঁর সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। কেউ যেন সাধারণ মানুষকে হেনস্তা, চাঁদাবাজি কিংবা বলপূর্বক জমি দখল করতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে কঠোর সতর্ক থাকার তাগিদ দেন তিনি।

লালমোহন ও তজুমদ্দিন থানাকে মাদকমুক্ত করতে কঠোর বার্তা দিয়ে স্পিকার জানান, মাদকের বিষবৃক্ষ উৎপাদনে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে হবে। দলের প্রভাবশালী কোনো নেতাও যদি মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে তাকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, লালমোহন ও তজুমদ্দিনে আর কোনোভাবেই মাদকের বিস্তার দেখতে চান না। তাঁর দাবি, বিগত সরকারের আমলে এই অঞ্চলে মাদকের রমরমা বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর জোর দিয়ে স্পিকার বলেন, মুসলমান হিসেবে আমাদের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব হলো অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং তাঁদের সব কাজে সহযোগিতা করা। প্রত্যেক নাগরিকেরই নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কেউ যেন কোনো ধরনের অত্যাচার চালাতে না পারে, সে বিষয়ে সকলকে সজাগ থাকতে হবে। এ সময় তিনি সারাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় রাখার আহ্বান জানান।

আইপিইউর এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপে মোট ৩৭টি দেশ সদস্য রয়েছে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংসদীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও পোক্ত হয়েছে এবং বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি বহুগুণ উজ্জ্বল হয়েছে।

লালমোহন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জাফর ইকবালের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম বাবুল, পৌর বিএনপির সভাপতি সাদেক মিয়া জান্টু, সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বাবুলসহ স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে স্পিকার ১৫০ জন অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে আর্থিক সহায়তা হিসেবে প্রত্যেকের হাতে ১০ হাজার টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন। পরবর্তীতে বিকেলে লালমোহনের মঙ্গল সিকদার এলাকায় একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন এবং সন্ধ্যায় স্থানীয় বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করার কথা রয়েছে তাঁর।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ