ভোট দেওয়া-না দেওয়া সবার সরকার হতে চাই
রংপুর প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (২০ অক্টোবর): নির্বাচনে ভোট দেওয়া বা না দেওয়ার পার্থক্য না করে সকল নাগরিকের কল্যাণে সমানভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর মতে, সরকার এমন একটি কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে চায়, যেখানে ভোটদানকারী নাগরিকদের পাশাপাশি ভোটবিমুখ ব্যক্তিরাও সমানভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সেবা লাভ করবেন। পাশাপাশি, দেশের সব ধর্মের মানুষকে সুসংহত করে একটি কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১টার দিকে রংপুর মহানগরীর ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিদর্শনকালে প্রদত্ত বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভলগ্নে এই মন্দির পরিদর্শনের সময় তিনি মন্দির কর্তৃপক্ষের নিকট ১০ লাখ টাকার আর্থিক অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন। এর পূর্বে দুপুর ১২টার দিকে মহানগরীর প্রেসক্লাবসংলগ্ন ওই মন্দিরে উপস্থিত হয়ে তিনি পূজার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় সম্পন্ন করেন।
এ সময় দেশের প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, শত শত বছর ধরে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ এই ভূখণ্ডে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। আগামী শতাব্দীগুলোতেও যেন এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অটুট থাকে, সেই অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আমাদের সকল ধর্মমতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।’
সব অঞ্চল ও মানুষের মাঝে সমতার ভিত্তিতে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিচার করে দেশের নানা প্রান্তে সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সচেষ্ট রয়েছে সরকার। এ সময় রংপুর মহানগরের সামগ্রিক উন্নয়নে একটি বিশেষ বৈঠকে আলোচিত ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরে তারেক রহমান জানান, জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রান্তিক জনপদের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার পরিধি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পর্যায়ক্রমে সেতু, কালভার্ট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জরুরি স্থাপনাগুলো নির্মাণ করা হবে।
উন্নয়নমূলক এসব উদ্যোগ সফল করতে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অনৈক্য বা বিভাজন ভুলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। তাঁর ভাষ্যমতে, দেশের প্রকৃত অগ্রগতি সাধিত করতে হলে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে এসে পারস্পরিক দূরত্ব ঘোচাতে হবে।
জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সব রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদীয় ফোরামে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে পারেন। সেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে যেটি সবচেয়ে কল্যাণকর হবে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারণ করা উচিত।
রাজনৈতিক কর্মসূচির জেরে যাতে সাধারণ মানুষের জনজীবন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়েও কড়া গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরূপ প্রভাবে যেন জনসাধারণের দৈনন্দিন চলাচল, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা, চিকিৎসাসেবা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম কিংবা কর্মসংস্থানে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি।
তারেক রহমান আরও বলেন, এ দেশের সাধারণ মানুষ সবসময়ই শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার পরিবেশ কামনা করে। বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনেই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিশুদের সুশিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করা, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি এবং দেশজুড়ে সুশৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
রাষ্ট্রের ভেতরে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যখন একটি শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালাচ্ছে, তখন একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন উপায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০24 সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলোকে মুছে ফেলার যেকোনো চক্রান্ত জনগণ শক্ত হাতে প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তিনি সাধারণ জনতাকে উল্লেখ করে তাদের সবসময় পাশে থাকার আহ্বান জানান।
মন্দিরের সন্নিকটে নির্মাণাধীন একটি অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, সেখানে অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামঞ্চল থেকে শহরে এসে যাদের রাত্রিযাপন বা থাকার ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তারা এই সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
উক্ত নির্মাণকাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য আরও অর্থের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এই কাজ সম্পন্ন করতে তিনি সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি নিরাপদ ও সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ গঠনে তিনি সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সামরিক বিমানযোগে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে তিনি তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে আয়োজিত পথসভায় বক্তব্য দেন। ধর্মসভা মন্দিরে তাঁর গাড়ি বহর পৌঁছালে রাস্তার দুপাশে অবস্থান নেওয়া অজস্র মানুষ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে রংপুর শহরে ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি বিগত পাঁচ দিন ধরে শহরের বিভিন্ন সড়কে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সৌন্দর্যবর্ধন ও মেরামতের কাজ পরিচালিত হয়। রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ এবং শহরের ডিসির মোড় থেকে লালকুঠির মোড় পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১৫০ মিটার রাস্তা সংস্কার করা হয়। তবে অতিদ্রুত এই সংস্কারকাজ সম্পন্ন হওয়ায় কাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।
রংপুরের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি সফল করার পর একই দিনে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
মনোয়ারুল হক/
