মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি জানিয়ে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার আইনজীবী দলের চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১ এপ্রিল) : চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার আইনজীবী দলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে।

Letter to ICT sent on behalf of Sheikh Hasina 30.03.2026_45956394_13 (1)

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পক্ষে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ল ফার্ম কিংসলি ন্যাপলির পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেভাবে তার অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয়েছে এবং যেভাবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাতে ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যায্য বিচারের মৌলিক মানদণ্ড’ লঙ্ঘন হয়েছে।

গত ৩০ মার্চ ইমেইলের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো ওই চিঠিতে শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়াকে ‘অন্যায্য ও অবৈধ’ বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের বক্তব্য জানার চেষ্টা করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

জুলাই আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যায় উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দেওয়ার চার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে গতবছরের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানো শেখ হাসিনা তখন থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন। সব অভিযোগ অস্বীকার করে সেখান থেকেই এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই বিচারে তিনি কিংবা তার দলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ন্যায্য সুযোগ’ দেওয়া হয়নি।

কিংসলি ন্যাপলির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বিচার এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগ এবং এর নেতাকর্মী-সমর্থকরা ছিলেন এক ‘বৈরী পরিবেশের মধ্যে’।

২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দলটির অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এবং ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ শিকার হন। এমনকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত অনেক আইনজীবীও গ্রেপ্তার ও ‘শারীরিক হেনস্থা’র শিকা হন, যা বিচার প্রক্রিয়াকে ‘আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে’ বলে কিংসলি ন্যাপলির ভাষ্য।

কেন এই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যায় চারটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতার অভাব’, প্রসিকিউশনের ‘পক্ষপাত’, যথাযথ প্রক্রিয়া ও ন্যায্য বিচারের অধিকার থেকে ‘বঞ্চনা’ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘পূরণ না করেই’ সাজা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে সেখানে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, “এই বত্যয়গুলো পৃথক ও সম্মিলিতভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে অন্যায্য করে তুলেছে এবং এর ফলে কোনো বৈধ ফলাফল অর্জন সম্ভব নয়।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সেই আইন সংশোধন করে এ আদালতে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ বিচারের উদ্যোগ নেয়, যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে শেখ হাসিনার আইনজীবী দলের চিঠিতে।

সেখানে বলা হয়েছে, আইন সংশোধনের মাধ্যমে “ট্রাইব্যুনালের মূল সাংবিধানিক উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে এর ম্যান্ডেট বিস্তৃত করা হয়েছে” এবং বাংলাদেশের ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ারকে “অগ্রাহ্য করা হয়েছে।”

কিংসলি ন্যাপলি বলছে, “শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত কার্যক্রমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার মৌলিক মানদণ্ড পূরণে একাধিক গুরুতর ব্যর্থতা দেখা যায়। ট্রাইব্যুনালের গঠনপ্রক্রিয়া, বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি ও সময়, নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের যোগ্যতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, এবং বিচার চলাকালে তাদের আচরণ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে নির্ধারিত সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর প্রতি পদ্ধতিগত অবহেলা স্পষ্ট হয়।”

আর ট্রাইব্যুনাল “স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার শর্ত পূরণে ব্যর্থ” হওয়ায় শেখ হাসিনার ন্যায্য বিচারের অধিকার “লঙ্ঘিত হয়েছে” বলে দাবি করছে এই ল ফার্ম।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে চিঠিতে বলা হয়েছে, তখনকার প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম আগে ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিকভাবে তিনি ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। বিচার কার্যক্রম চলাকালেও তিনি রাজনৈতিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বিচার চলাকালে প্রসিকিউশনের ভেতরে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সে কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে। সেখানে বলা হয়েছে, ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের কারণে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা “মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

কিংসলি ন্যাপলি বলছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রমাণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি। তার পক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা লড়ার সুযোগ পাননি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে।

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার এই বিচার ‘যৌক্তিক ছিল না’ দাবি করে চিঠিতে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডের সমতুল্য।”

এসব যুক্তি দেখিয়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে চিঠিতে। পাশাপাশি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ না নেওয়ার, ভবিষ্যতে যে কোনো বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালনা করার, শেখ হাসিনার আইনজীবী ও অন্য ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং শেখ হাসিনার ‘অধিকার লঙ্ঘনের’ বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

এ বিষয়গুলোর সুরাহা করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হল, তা জানিয়ে ১৪ দিনের মধ্যে চিঠির জবাব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে কিংসলি ন্যাপলি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ