দেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি

স্বাস্থ্য ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১ এপ্রিল) : দেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, ৯ মাস বয়সের আগে শিশুদের সাধারণত হামে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়, কারণ এ সময় পর্যন্ত তারা মাতৃগর্ভ থেকে পাওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতার সুরক্ষায় থাকে। কিন্তু চলতি মৌসুমে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বর্তমানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ৯ মাসের আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনাও।

তবে এত অল্প বয়সী শিশুরা কেন আক্রান্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। যদিও এ ধরনের কোনো গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবে শুরু হয়েছে কি না, সে বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, ‘দলগত ভাবে’ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। অন্তত ছয় মাস বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বজায় রাখা প্রয়োজন। কমে গেলে ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক টিকা কার্যক্রমে নিয়ে আসা যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত মাসেই মারা গেছে ৩২ জন। বেসরকারি হাসপাতালসহ জেলা পর্যায়ের সার্বিক তথ্য বিবেচনায় এ সংখ্যা ৪৬ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিশুদের অনেকের মধ্যে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের সংক্রমণও ছিল। সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৮৪ জন হামে আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। এর বাইরে হামের উপসর্গ নিয়ে কয়েক হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, ময়মনসিংহ-সহ বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চার, রাজশাহীতে তিন ও পাবনায় একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রিয়াজ মোবারক সাংবাদিকদের জানান, এবার ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা সচরাচর ঘটে না। মায়েদের টিকা নেওয়া না থাকলে বা শিশুর সঠিক সময়ে টিকা না দিলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।

এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত সোমবার জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিয়মিত সুপারিশের বাইরে গিয়ে ছয় মাস বয়স থেকেই টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছে সরকার।

সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুন মাসের শুরুতে মাসব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হতে পারে। এতে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ডোজ দেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হতে পারে, তবে এটি শুধুমাত্র এই বিশেষ কর্মসূচির জন্য প্রযোজ্য হবে। যদিও কম বয়সে টিকা দেওয়ার কার্যকারিতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

হামের বিস্তারের পেছনে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত ও সময়মতো অপারেশন প্ল্যানিং বা ওপি না করাকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ইপিআইয়ের পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, গত বছর নানা কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি তিনবার ব্যাহত হয়েছিল। ভিটামিন-এ এবং কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানোর কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়ায় শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে। এটিও হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে হামের টিকার মজুত প্রায় শেষের দিকে এবং মাঠপর্যায়ে মাত্র এক মাসের সরবরাহ রয়েছে। তবে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ৬০৪ কোটি টাকার টিকা কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এপ্রিল মাস থেকেই টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের এই অস্বাভাবিক সংক্রমণের প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা এবং শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চালু থাকলে হাম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু গত বছর টিকাদান কার্যক্রম ও ‘ওপি’র মতো বিশেষ কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় সংক্রমণ বেড়েছে। এর ফলে শিশুদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় সমষ্টিগতভাবে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, মায়েদের সচেতন হতে হবে বেশি। যত বেশি শিশুকে একসঙ্গে টিকার আওতায় আনা যাবে, তত দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে আবার নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ফিরে আসা যেতে পারে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ