কুমেক হাসপাতালে শয্যাসংকটে হাম আক্রান্ত শিশুদেরকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক (কুমিল্লা), এবিসিনিউজবিডি, (১ এপ্রিল) : সারাদেশে হামের প্রকোপের মধ্যেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে চরম শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। ৫০০ শয্যার এই সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগে হাম আক্রান্ত অনেক শিশুকে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে রোগী ও তাদের স্বজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সরেজমিনে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড়ে ওয়ার্ডগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আশপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জামা-জুতো, থালা-বাটি। এই পরিবেশেই সন্তানদের পাশে বসে উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন অভিভাবকরা। সবার চোখে-মুখেই অজানা আতঙ্ক।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু বিভাগে রোগীদের জন্য শয্যা রয়েছে ৫২টি। কিন্তু বর্তমানে এখানে ভর্তি রয়েছে ১৭৯ জন। তাদের মধ্যে হাম আক্রান্ত রোগী ১৫ জন। শুধু কুমিল্লার ১৭ উপজেলাই নয়; পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী থেকেও এখানে মানুষজন চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, ১৮ মার্চ থেকেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। বাড়তি রোগীদের হাসপাতালের মেঝেতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যদিও হাম আক্রান্ত শিশু রোগীদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাকে আলাদা বিশেষায়িত ওয়ার্ড গঠন করা হয়েছে।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মা তামান্না আক্তার বলেন, ‘নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে এনেছিলাম। পরে শরীরে র‌্যাশ ও গুটি দেখা দিলে হাম ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। কিন্তু বেড না পেয়ে মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।’
ব্রাহ্মণপাড়া থেকে আসা আরেক অভিভাবক আসমা ফেরদৌস জানান, এক কক্ষে অতিরিক্ত রোগী ও স্বজন থাকায় গাদাগাদি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সদর দক্ষিণ থেকে আসা আক্রান্ত শিশুর বাবা সজিবুল ইসলাম বলেন, ‘একজন থেকে আরেকজন যেন আক্রান্ত না হয়, এ জন্য বড় জায়গা ও পর্যাপ্ত বাতাস দরকার। রোগী বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

দেবিদ্বার থেকে আসা সাত মাস বয়সী এক রোগীর মা জানান, প্রথমে সামান্য জ্বর ও ঠাণ্ডা-কাশি ছিল। না কমায় স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে এখানে ভর্তি করেছি। কিন্তু বেড না পেয়ে মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে। হাম নিয়ে চারদিকের নানা কথা ছড়াচ্ছে। এসব কথা শুনে খুব ভয় লাগছে। একই রকম শঙ্কার কথা জানান নোয়াগাঁও থেকে আসা ছয় মাস বয়সী সাফওয়ানের অভিভাবকও। চারদিন ধরে হাসপাতালে থাকলেও শিশুটির শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

শয্যাসংকটের কথা স্বীকার করে নিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজ বলেন, আমাদের শিশু ওয়ার্ডে ৫২টি শয্যা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ওখানে রোগীর সংখ্যা ১৭৯ জন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগী আরও বাড়লে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করতে আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। গত ১৮ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, দুজনকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে। বর্তমানে ১৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

আক্রান্ত শিশুদের অনেককেই টিকা দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের বড় অংশই হামের টিকা (ভ্যাকসিন) নেয়নি। কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা টিকার কার্যকারিতা কম থাকার কারণে হতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, হাম থেকে মস্তিষ্কের জটিলতা, নিউমোনিয়া, কানে প্রদাহ এবং কিডনি বা লিভারের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির জানান, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২১ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে এবং শিশুদের পাশাপাশি বয়স্কদের মধ্যেও সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় হাম আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় উপসর্গ নিয়ে তিন শিশু মারা গেছে। তবে তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এদিকে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ