চোরাই তেল মজুতের রমরমা কারবার চট্টগ্রামের ২০টি স্থানে

চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (১ এপ্রিল) : দেশের জ্বালানি তেল বিপণনের তিন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান–পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানির তেলের লরি গন্তব্যে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের ওই ২০ স্থানেই বিক্রি করে দিচ্ছেন চালকরা। চলতি পথে তেলের ভাউচার বা লরি থেকে প্রকাশ্যে পাইপের মাধ্যমে নামিয়ে ফেলা হয় ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন। এ অবৈধ ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চললেও দেখার কেউ নেই। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট লরি ছাড়াও প্রাইভেট কার, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন গাড়ির তেলের ট্যাংকি থেকে অবৈধভাবে তেল সংগ্রহ করে তা মজুত ও বিক্রি করছে বলে অভিযোগ আছে।

দেশের চরম জ্বালানি তেলসংকটের মধ্যে চট্টগ্রামের ২০টি স্থানে চুরি করা জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রির অবৈধ কারবার চলছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বায়েজিদ এলাকার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৮-১০টি অবৈধ চোরাই তেলের অস্থায়ী দোকান রয়েছে। হালিশহরের লিংক রোডে ৬ থেকে ৭টি স্থানে এবং পতেঙ্গার আরও ৬টি স্থানে ক্রয়-বিক্রয় হয় চোরাই তেল। পতেঙ্গায় বিপিসির ডিপো থেকে জ্বালানি তেল লরিতে তোলার পর চালকরা তাদের সুবিধামতো অন্তত ২০টি স্থানে তেল বিক্রি করে দেন। বিক্রি করা তেলের ঘাটতি মেটাতে লরিগুলো সড়কের পাশে রোদে দাঁড় করিয়ে তেলের তাপমাত্রা বাড়ানো হয় যাতে তেলের ঘনত্ব কমে ওজনে বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চালক জানান, একটি লরিতে আকারভেদে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার লিটার তেল ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। সেখান থেকে ১০০ লিটার বিক্রি করে দিলে তা ধরা পড়ে না। এ ছাড়া লরিতে তেল ভরার আগে তারা লরির ঢাকনা খুলে রোদে গরম করে নেন। এ ছাড়া চলার সময় ঝাঁকুনিতে তেলের পরিমাণ ওজনে বেড়ে যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু তেল বাইরে বিক্রি করে দেন চালকরা। বিক্রির টাকায় তাদের দৈনিক পকেট খরচ হয় বলে জানান তারা।

এদিকে দেশের জ্বালানি তেলের সংকটের সময়ে চোরাই তেল স্টক বা মজুত করার বিরুদ্ধে প্রশাসন অভিযানে নেমেছে। গত সপ্তাহে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় অভিযানে প্রায় ৬ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়। চোরাই তেল মজুত করছিল সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট। তবে একইভাবে চট্টগ্রামের অন্যান্য স্থানে চোরাই জ্বালানি তেল মজুত করা করলেও প্রশাসনিক অভিযান চোখে পড়েনি এলাকাবাসীর।

এসব চোরাই তেলের দোকানের কোনো ধরনের লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই। বিপিসির জ্বালানি তেলের পরিবহনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এসব চোরা কারবারির দোকান।

দেশে তেলের দাম বৃদ্ধির খবর ছড়িয়ে পড়ার কারণে তেল মজুতের দিকে ঝুঁকেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে মারাত্মক প্রভাব পরছে জ্বালানি তেলের সরবরাহ লাইনে। বর্তমানে ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি না পাওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন চোরেরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, আরেফিন নগর এলাকার শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি গাড়ি থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল নামানো হচ্ছে। পরে তা ড্রাম ও প্লাস্টিকের পাত্রে ভরে পাশের ঝুপড়ি দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল এভাবে সংগ্রহ ও মজুত করা হচ্ছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সংস্থাকে ‘ম্যানেজ’ করে এটা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা রোডের উত্তর কাট্টলি ও হালিশহর এলাকায় রব্বানির দোকান, রমিজের দোকান, শাহ আলমের দোকান, শাখাওয়াতের দোকানে দেখা যায় বিভিন্ন সাইজের লম্বা পাইপ দোকানের বাইরে ঝুলছে। এই পাইপ দিয়েই লরি থেকে তেল নেওয়া হয়। বায়জিদের ক্যান্টনমেন্ট গেট সংলগ্ন এলাকায় শহীদ, সোহেল; শেরশাহ মোড়ে কালাম ও পেয়ারু; বায়েজিদ লিংক রোডে মহিউদ্দিন, আবদুর রহিম, আবদুল মজিদ, বক্কর, গাফ্ফার ও নওশাদ সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কয়েকজন চোরাই ব্যবসায়ী দাবি করেন, তারা বৈধভাবে তেল ক্রয়-বিক্রয় করছেন। তাদের ভাষ্য, গাড়ির চালকরাই অতিরিক্ত তেল বিক্রি করেন এবং তারা তা কিনে থাকেন। চোরাকারবারিদের দাবি, টহলরত পুলিশ সদস্যরাও নিয়মিত বখরা নেন। এমনকি কিছু অসাধু ব্যক্তিও সাংবাদিক পরিচয়ে অর্থ আদায় করেন।

ক্যান্টনমেন্ট গেটসংলগ্ন উত্তর পাশে প্রকাশ্যে রমরমা চোরাই তেলের ব্যবসা করছেন মোহাম্মদ শহীদ উদ্দিন। পাশের একজন চায়ের দোকানদার জানান, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি যানবাহন দাঁড়িয়ে তেল দেয় শহীদকে। প্রাইভেট কার থেকে শুরু করে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ড্রাম ট্রাক, পদ্মা মেঘনা ও যমুনার তেলের লরি থেকে তেল নেন শহীদ। প্রতিদিন কমপক্ষে ১ হাজার লিটার তেল মজুত করা হচ্ছে সেখানে।

গত রবিবার রাতে সেখানে দেখা যায়–লরি, প্রাইভেট কার, কাভার্ড ভ্যান থেকে তেল নামানো হচ্ছে। এর ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে খবরের কাগজের কাছে।

আরেফিন নগর ময়লা ডিপোর পাশের অবৈধ তেল ব্যবসায়ী আবদুল গফফার বলেন, ‘বৈধভাবে তেলের ব্যবসা করতে হলে অনেক কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া খোলা তেল বিক্রি করা যায় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। এই চোরা তেলের ব্যবসা করে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি লাভ হয়। তবে এর ওপর ভিত্তি করে কয়েকজন শ্রমিকের সংসারও চলছে বলে দাবি করেন তিনি।’
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করা শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। দ্রুত এ বিষয়ে নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এলাকাবাসীরা জানান, এসব দোকানি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি থেকে চুরি করা তেল কম দামে কিনে এসব দোকানে বিক্রি করা হয়। রাতে এ কারবার বেশি হয়। দেশের মানুষ বৈধভাবে জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না, সেখানে অবৈধ বাণিজ্য চলছে রমরমা। এ চোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের নগরের কাট্টলি সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্টেট হুছাইন মুহাম্মদ বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। এর মধ্যে দাম বৃদ্ধির আশায় যারা মজুত করছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। চোরা তেলের মজুত ও তেল চুরির বিষয়েও আমরা ব্যবস্থা নেব।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, ‘সরকার ডিপো থেকে যে তেল দেয় তা সরাসরি ডিপোতে যাচ্ছে কি না, সেটি তদারকি করলে বেশি ফলপ্রসূ হতো। এখন সরকার ভোক্তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চোরেরা তেল মজুত করছে। এই সংকটের সময়ে চোরাই তেলের কারবার বন্ধ করা জরুরি।’

বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। তবে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সংকটকে উসকে দেওয়ার জন্য যারা মজুত করছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্থান থেকে তেল জব্দ করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত আছে। পর্যায়ক্রমে সব স্থানে অভিযান চলবে। আর যারা সরকারি তেল চুরির সঙ্গে জড়িত তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ