নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৭ মার্চ) : গত বছরের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ শুক্রবার (২৭ মার্চ) শপথ নিয়েছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া বালেন্দ্র শাহ। ৩৫ বছর বয়সী এই তরুণের উত্থান নেপালের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অভিজাত শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কাছে তার পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
শুক্রবার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ‘বালেন’ নামে পরিচিত এই জনপ্রিয় নেতা নেপালের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে একটি গান প্রকাশ করেন।
আন্ডারগ্রাউন্ড র্যাপ দৃশ্য থেকে উঠে আসা এই শিল্পী তার গানে নেপালের ঐক্য ও নতুন ইতিহাস গড়ার ডাক দিয়েছেন, যা প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখ লাখ মানুষ দেখেছে।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে মাত্র তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর, শাহ ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং এই মাসের সাধারণ নির্বাচনে এক নির্ণায়ক জয় ছিনিয়ে আনেন। তার সমর্থকরা তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখলেও, সমালোচকরা মাত্র চার বছরের পুরনো দল আরএসপি’র বিশাল প্রতিশ্রুতি পূরণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিদ্রোহী র্যাপার থেকে রাষ্ট্রপ্রধান
১৯৯০ সালে কাঠমান্ডুর নরদেবীতে জন্ম নেওয়া বালেন্দ্র শাহ পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। ২০১৩ সালে নেপালের একটি জনপ্রিয় র্যাপ ব্যাটলে জিতে তিনি আলোচনায় আসেন। তার তীক্ষ্ণ লিরিক্সে সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত প্রজন্মের ক্ষোভ ফুটে উঠত। তার জনপ্রিয় গান ‘বলিদান’ ইউটিউবে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ দেখেছে, যেখানে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের কষ্ট তুলে ধরেছেন।
২০২২ সালে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি সবাইকে চমকে দেন। মেয়র হিসেবে তার মেয়াদে শহর পরিষ্কার করা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বুলডোজার চালানো নিয়ে যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি হকার ও বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করায় সমালোচিতও হয়েছেন।
ক্ষমতায় আরোহণ
গত সেপ্টেম্বরে নেপালে হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনে শাহ’র গানগুলো বিক্ষোভকারীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার জেরে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ৭৭ জন প্রাণ হারান, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। শাহ তার প্রচারণায় প্রথাগত মিডিয়া এড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করেছেন এবং ১২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গত ৫ মার্চের নির্বাচনে আরএসপি নেপালের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে ধসিয়ে দেয়। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি’র দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝাপা-৫ আসনেও তাকে পরাজিত করেন শাহ।
চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক
উত্থান চমকপ্রদ হলেও বালেন্দ্র শাহ বিতর্কহীন নন। মেয়র থাকাকালীন হকারদের বিরুদ্ধে কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে মানবাধিকার সংস্থাগুলো তার সমালোচনা করেছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও রাজনৈতিক দল নিয়ে কড়া মন্তব্য করে পরে তা মুছে ফেলায় তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।
এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে পাহাড়সম প্রত্যাশা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসী নেপালি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, দেশের বেকারত্ব দূর করা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সাথে গত বছরের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলির বিচার শুরু করবেন কি না, সেই কঠিন সিদ্ধান্তও এখন তার হাতে। সূত্র: বিবিসি
মনোয়ারুল হক/
