৫ মাসে ৬ শতাংশেই আটকে আছে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩ ডিসেম্বর) : বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, আগস্টে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং সবশেষ গত অক্টোবরে তা আরও কমে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে গেছে।
অর্থাৎ পাঁচ মাস ধরে ৬ শতাংশের বৃত্তেই আটকে আছে দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। সেই হিসাবে অর্থবছরের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে ২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এদিকে, নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাঙাভাব দেখা গেলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। বিদায়ী অর্থবছরের পুরোটা সময়ই বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমেছে। চলতি অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আগের মুদ্রানীতিতে বেশি থাকলেও তা পূরণ হয়নি। জুন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল প্রায় ১০ শতাংশ, অর্জন হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশের মতো। দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ও নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে আগামী জানুয়ারিতে ঘোষিত পরবর্তী মুদ্রানীতিতেও কোনো সুখবর থাকছে না। তবে মুদ্রা সরবরাহের দিক থেকে কিছুটা বাড়িয়ে ডিসেম্বরে এটি ৮ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্য ধার্য হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থপ্রবাহ কমিয়ে রাখার যে নীতি ঠিক করেছে, ঋণ প্রবাহের এই প্রবৃদ্ধি তারও অনেক নিচে নেমে গেল। সংকোচনমূলক নীতি বজায় রাখার ধারাবাহিকতায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়ার অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। বিদায়ী অর্থবছরজুড়েই এই সূচকটি কমতে থাকায় আগামী দিনে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবশেষ গত অক্টোবরে ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ। যদিও সুদহার বৃদ্ধির কোনো সুফল জনগণ পায়নি। বরং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি যখন সর্বনিম্ন, তখনো মূল্যস্ফীতির হার খুব বেশি কমতে দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হলো বেসরকারি খাত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে খাতটিকে ঋণবঞ্চিত করা হচ্ছে। যদিও মূল্যস্ফীতি না কমে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আরও বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন নতুন নীতিমালা, ঋণের উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিসহ নানা কারণে বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশ পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ডিসিসিআিইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আছি, তারা বিদ্যমান ব্যবসা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সে চেষ্টা করছি। ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার কথা কেউ ভাবছে বলে জানা নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সরকার কারও সঙ্গে আলোচনায়ও বসছে না। এত উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ নিয়ে আর ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে নতুন ব্যবসা করাও অনেক কঠিন।’
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক না হওয়ায় বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে ঋণের চাহিদাও বাড়ছে না। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অনেকদিন ধরেই জিডিপির আনুপাতিক হারে একই পর্যায়ে অর্থাৎ ২২-২৩ শতাংশই রয়ে গেছে। বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে সচেতন থাকলেও দৃশ্যমান তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। তারা বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে সেটা খুব বেশি বলা যাবে না। যে কারণে ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। তবে তারা যদি ঋণ চায়, তাহলে আমরা তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।’
মনোয়ারুল হক/
