চলতি সংসদ অধিবেশনেই অংশীদারত্ব চুক্তি পাস করতে চায় জাপান

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৮ অক্টোবর): বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি এই অঞ্চলে বেইজিংয়ের বাড়তে থাকা প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) চলতি সংসদ অধিবেশনেই পাস করাতে চায় জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। এই চুক্তিটি প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে শুল্ক-সংক্রান্ত কারিগরি ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে ঢাকাকে নানাভাবে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

খ্যাতনামা জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের আগামী মাসের সমাপনী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ ঘটে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির সময় পূর্বের মতো শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। তবে জাপানের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক চুক্তিটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে যে নতুন শুল্কের বোঝা তৈরি হতে পারে, তার নেতিবাচক চাপ অনেকাংশেই সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উভয় দেশের মাঝে ঐতিহাসিক এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে উভয় দেশের জাতীয় সংসদে এর অনুমোদন লাভসহ সব ধরনের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একে অপরকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যেই চুক্তিটি সম্পূর্ণ কার্যকর রূপ লাভ করতে পারে।

এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ কর্তৃক জাপান থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন মোটর গাড়ির ইঞ্জিন ও টায়ার আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক আগামী দেড় দশকের (১৫ বছর) মধ্যে পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। পাশাপাশি, জাপানে উৎপাদিত আধুনিক যাত্রীবাহী গাড়িগুলো ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ন্যায় সমান বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে জাপানি বাজারে পাঠানো পোশাক ও বস্ত্র খাতের পণ্যের ওপর থেকেও সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে এলডিসি উত্তরণের পরও জাপানের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের মূল্য অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকবে না। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করতে গিয়ে কোনো ধরনের ক্ষতিকর বা অসুবিধাজনক শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়, সেই সম্ভাব্য ঝুঁকি দূর করার বিষয়টি মাথায় রেখেই জাপান সরকার খসড়া প্রণয়নে ঢাকাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছে।

নির্দিষ্ট কোন কোন খাতে শুল্কহার হ্রাস করা প্রয়োজন কিংবা কোন কোন অভ্যন্তরীণ দেশীয় শিল্পপণ্যকে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় রাখা বাঞ্ছনীয়—কেবল এই আলোচনার মাঝেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি জাপান। চুক্তির প্রতিটি নির্দিষ্ট ধারার অর্থনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো কেমন হতে পারে, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছে দেশটি। একই সঙ্গে, এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রে কেমন আইনি কাঠামো থাকা দরকার, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও তারা প্রদান করেছে।

বাংলাদেশের এই যুগান্তকারী প্রথম অর্থনৈতিক চুক্তিটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বিষয়ক আলোচনার শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হবে। বিশ্বমঞ্চে চীন যখন ঢাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও নিবিড় করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই অংশীদারত্ব চুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মনীতির একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক আমদানির সর্ববৃহৎ উৎস চীন হওয়ায় বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ মজবুত। গত ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ নিরাপত্তা এবং বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে আসছে।

জাপানি পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন যে, ‘চীন সর্বদা নিজেদের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই যেকোনো অর্থনৈতিক চুক্তি প্রণয়ন করে থাকে।’

জাপানের ইতিপূর্বে সিপিটিপিপি বা কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স–প্যাসিফিক পার্টনারশিপের মতো বড় আকर्ষণের অর্থনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের সেই দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে জাপান একদিকে যেমন ঢাকাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরালো করতে সচেষ্ট, অন্যদিকে এই ভৌগোলিক অঞ্চলে চীনের একাধিপত্য কমিয়ে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখতেও গভীরভাবে আগ্রহী।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ