উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ

স্বাস্থ্য ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩১ মার্চ) : সারা দেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ এখন আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। গত তিন মাসে রাজধানীসহ বরিশাল, কুমিল্লা, চাঁদপুর, পাবনা, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উপসর্গসহ আক্রান্ত ৬ শতাধিক। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছেই। শয্যাসংকটে অনেক জায়গায় শিশুদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

রাজধানীর এক হাসপাতালেই ২২ শিশুর মৃত্যু
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরে মার্চ পর্যন্ত ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট তানজিনা জাহান জানান, চলতি মাসের ২৯ দিনেই ৪৪৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। গত রবিবার সেখানে ৪৫ জন চিকিৎসাধীন ছিল।

বরিশালে নতুন করে আক্রান্ত ২৩ জন
বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বরিশাল বিভাগে হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। গত তিন মাসে ছয় জেলায় ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৯ জন চিকিৎসাধীন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ২৩ জন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, সংক্রমণ বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি থাকায় শিশুরা ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যমতে, বরগুনার পরিস্থিতি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। সেখানে ৮০ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ২২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল সিটি এলাকায় ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনই আক্রান্ত। শের-ই-বাংলা মেডিকেলে ১৯ জনসহ জেলায় ৩৩ জন ভর্তি আছে। ভোলায় ১৬ জন আক্রান্ত। ঝালকাঠিতে ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের হাম পাওয়া গেছে। পটুয়াখালীতে চিকিৎসাধীন ১২ জন ও পিরোজপুরে একজন আক্রান্ত।

শের-ই-বাংলা মেডিকেলের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে এম নজমুল আহসান বলেন, ‘হামের লক্ষণ জ্বর, সর্দি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।’ তিনি ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

কুমিল্লায় ২১ শিশু চিকিৎসাধীন
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, জেলায় হামের প্রকোপ বাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে কুমিল্লায় ২১ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ জানান, আক্রান্তদের বিশেষায়িত সেবা দিতে আলাদা ওয়ার্ড গঠন করা হয়েছে। গত ১৮ মার্চ থেকে ২৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তিনি জানান, আক্রান্তদের বড় অংশ টিকা নেয়নি। হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের সমস্যা, কানের প্রদাহ বা কিডনি ও লিভারের ক্ষতি হতে পারে।

চাঁদপুরে ৩ শিশুর মৃত্যু, শয্যাসংকটে মেঝেতে চিকিৎসা
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২৩ শিশু ভর্তি রয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. নূরে আলম দ্বীন জানান, আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলোকে বাড়তি ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সদর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত বেড না থাকায় আক্রান্ত শিশুদের মেঝেতে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তাদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজনকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে।’

পাবনায় ব্যাপক প্রকোপ, ২ শিশুর মৃত্যু
পাবনা প্রতিনিধি জানান, জেলায় হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নতুন ৮ জনসহ ২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। গত তিন মাসে ৩৩ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আক্রান্ত হয়ে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, আক্রান্তদের বেশির ভাগই ৯ মাসের কম বয়সী। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে স্বাস্থ্য বিভাগ। পাবনা জেনারেল হাসপাতালের ৩৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

মুকসুদপুরে হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু, এলাকায় আতঙ্ক
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার মুকসুদপুরে হামের উপসর্গে তোহা নামে ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৯ মার্চ জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে সে অসুস্থ হয়। মুকসুদপুর ও ফরিদপুর ঘুরে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৭ মার্চ শিশুটি মারা যায়।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, অসুস্থতার কারণে শিশুটিকে ২৫ মার্চের নির্ধারিত টিকা দেওয়া যায়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রায়হান ইসলাম বলেন, ‘মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে নথি পর্যালোচনা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বর্তমানে কেস স্টাডি করছে।’

রামেক হাসপাতালে ভর্তি ২৭০ শিশু
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এ বছর ৩০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাহিদা ইয়াসমিন জানান, পরীক্ষায় মাত্র একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, বাকি ২৯ জনের নমুনায় পজিটিভ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে হাসপাতালে ২৭০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে, যাদের ৬৫ শতাংশেরই বয়স ছয় মাসের নিচে।

এদিকে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে দায়ী করেছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম। গতকাল সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে তিনি এ দাবি করেন।

ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত ৪ জানুয়ারি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এটি ছড়াচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর রোগটির পুনরুত্থান ঘটেছে। টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ও ভ্যাকসিনসংকটে আজ এই পরিস্থিতি।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ-উল-ইসলাম জানান, ১ হাজার ২০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকছে। এটি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চরম চাপ সৃষ্টি করছে।

চট্টগ্রামে আক্রান্ত ২, সতর্ক অবস্থানে স্বাস্থ্য বিভাগ
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৪০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে দুজনের শরীরে হামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে ২৯ মার্চ পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে ২৫ শিশু চিকিৎসাধীন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা বিশেষ কর্নার খোলা হয়েছে।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতাল পরিদর্শন করে জানান, চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৮ রোগীর মধ্যে একজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। বাকিরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে তীব্র সংক্রমণ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলায় গত কয়েক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৭৪ শিশু চিকিৎসাধীন। ২০ শয্যার বিপরীতে অতিরিক্ত রোগী হওয়ায় মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, ‘হামের তীব্রতা এখন সবচেয়ে বেশি। প্রায় ২০ বছর পর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, নমুনা সংগ্রহের তিন মাস পর রিপোর্ট পাওয়া যায়। এটি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ।

খুলনা ও নওগাঁয় হামের প্রাদুর্ভাব
খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনা বিভাগে ৭৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কুষ্টিয়ায় আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে ৬৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি। খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মুজিবুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত হাম ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হবে।

নওগাঁয় প্রতিনিধি জানান, সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘৩৮টি নমুনার মধ্যে পাঁচজন হাম ও একজন রুবেলায় আক্রান্ত। আগামী মে মাসে সারা দেশে শিশুদের এমআর টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে।’

সিলেট ও কক্সবাজারে বাড়তি সতর্কতা
সিলেট ব্যুরো জানায়, গত এক সপ্তাহে সংক্রমণ বাড়ায় শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট চালু হয়েছে। সেখানে ১৪ শিশু চিকিৎসাধীন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম আহমদ জানান, ৪ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মিজানুর রহমান জানান, চিকিৎসাধীন দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, ৩৫ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সদর হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শহিদুল আলম জানান, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও চোখের সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

নাটোরে আক্রান্ত ৬ শিশু 
নাটোর প্রতিনিধি জানান, হামে আক্রান্ত ৬ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে ৫ জন সদর হাসপাতালে ভর্তি। নাটোরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. কামাল উদ্দীন ভূঁইয়া জানান, জেলায় ৩৮ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসে। পরীক্ষা শেষে ১৩ জনের দেহে রোগ শনাক্ত হয়। ইতোমধ্যে ৭ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

ফরিদপুরে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় হামের প্রকোপ বাড়ছে। ২০ মার্চের পর থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতালে ১৪ শিশু ভর্তি হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন বিভাগ খোলা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, প্রতিটি শিশুকে গুরুত্ব দিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত জেলায় মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

সৌজন্যে: খবরের কাগজ

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ