স্বতন্ত্র প্রার্থীর ২৯ আসনে জটিল সমীকরণে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (২৭ জানুয়ারি) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছেন দলীয় পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে দেশের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা এসব প্রার্থীর কারণে একাধিক আসনে ভোটের সমীকরণ বদলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে রয়েছেন অন্তত ৯২ জন প্রার্থী, যারা ৭৯টি আসনে নির্বাচন করছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৯ জন প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক ও স্থানীয় জনপ্রিয়তার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা দলীয় প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাবেক সংসদ সদস্য বা উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন, সেখানে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এতে বিএনপির মূল প্রার্থীরা পড়ছেন প্রতিযোগিতামূলক চাপে, আবার কিছু আসনে জোট শরিক কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী দল বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, “কিছু এলাকায় ব্যক্তিগত বিরোধ আছে। দলের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। অনেকেই সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই সরে দাঁড়াবেন। এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে না বলে আমরা মনে করি।”

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেক স্থানীয় নেতা-কর্মী প্রকাশ্যেই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও স্থানীয় কমিটি বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা দলীয় প্রার্থীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

ঢাকায় চার আসনে আলাদা হিসাব

রাজধানীর ২০টি আসনের মধ্যে অন্তত চারটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে ভোটের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।

ঢাকা-৭ আসনে দলীয় প্রার্থী থাকলেও যুবদলের সাবেক নেতা ইসহাক সরকারের উপস্থিতি ভোট ভাগের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি-সমর্থিত জোট প্রার্থীর বিপরীতে বিদ্রোহী ও জামায়াত প্রার্থী থাকায় ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা-১৪ আসনে সাবেক এমপির পারিবারিক ভোটব্যাংক বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে।
আর ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারার জনপ্রিয়তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, যেখানে মূল লড়াই হবে তার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর।

ঢাকার বাইরে যেসব আসনে পাল্টে যেতে পারে ফল

ঢাকার বাইরে খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী-৬, কুড়িগ্রাম-৪, রাজবাড়ী-২, চট্টগ্রাম-১৬, সুনামগঞ্জ-৪, বাগেরহাটের একাধিক আসন, টাঙ্গাইল-৩ ও ৫, নাটোর-১ ও ৩—এসব এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা স্থানীয় উন্নয়ন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন। তরুণ ভোটারদের একটি অংশও পরিবর্তনের আশায় এসব প্রার্থীর দিকে ঝুঁকছেন।

জোট প্রার্থীরাও পড়ছেন চাপে

বিএনপি যেসব আসন জোট শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে, সেখানেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে সমীকরণ কঠিন হয়ে উঠেছে। ১৭টি আসনের মধ্যে মাত্র চারটি আসনে জোট প্রার্থীরা স্বস্তিতে আছেন বলে জানা গেছে। বাকি আসনগুলোতে স্বতন্ত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা জয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।

সিলেট-৫, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-৫, পটুয়াখালী-৩, নড়াইল-২, নারায়ণগঞ্জ-৪সহ একাধিক আসনে ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান বিএনপির জন্য শুধু আসনভিত্তিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সামগ্রিক নির্বাচনী কৌশলের জন্যও বড় পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর কতজন ভোটের মাঠে টিকে থাকেন এবং কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন—সেটিই নির্ধারণ করবে অনেক আসনের ভাগ্য।

মনোয়ারুল হক/  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ