ছাত্রদলের কাউন্সিলে নেতা নির্বাচনের ভাবনা, আলোচনায় এগিয়ে যারা
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১৮ মার্চ) : সিলেকশনের পরিবর্তে সরাসরি কাউন্সিলের মাধ্যমে সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংগঠনকে গতিশীল করতে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের এই তোড়জোড়। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা। এ সময় দলীয় প্রধান কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব করার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের সব মহানগর-জেলাসহ ইউনিট কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন। আগামী জুন-জুলাইয়ে ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ। এখন নতুন নেতৃত্ব গঠনের বিষয়ে বিএনপির ভেতরে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ছাত্রদলের সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশী নেতারা এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও লবিং-তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন। একই সঙ্গে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সে জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা সারা দেশের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। ইতোমধ্যে সংগঠনের এই শীর্ষ দুই পদে ডজনখানেক নেতার নাম আলোচনায় এসেছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের ব্যাপারে এখনো কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। এ ব্যাপারে কিছু জানি না। কমিটির বিষয়টি সম্পূর্ণ হাইকমান্ডের এখতিয়ার।’
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘সংগঠনের নতুন কমিটি হতে সময় লাগবে। তেমন তৎপরতাও দেখছি না। ভবিষ্যতে সংগঠনের অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে দায়িত্ব দেবেন, তা পালন করব ইনশাআল্লাহ।’
২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০০৪-০৫ সালের কমিটির পর থেকে ছাত্রদলের শীর্ষ দুই নেতাকে পরবর্তী কমিটিতে আর দেখা যায়নি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনের ভরাডুবির পর তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা ছাত্রদলের কমিটি পুনর্গঠনের দাবি তুলেছেন।
ছাত্রদল নেতাদের দাবি, ফ্যাসিস্ট আমলে ছাত্রদলের পরীক্ষিত, যোগ্য ও নির্যাতিত এবং যাদের সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে, তাদের মাধ্যমেই নতুন কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের নতুন ধারার রাজনীতির সঙ্গে মানানসই ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব নির্বাচন করা জরুরি। যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবেন এবং কোনো ধরনের ‘কোরামবাজি’ না করে সংগঠনকে শক্তিশালী করবেন, তাদের নিয়েই নতুন কমিটি গঠন করলে সংগঠন ভালো করবে।
২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ইতিহাসে প্রথমবার ভোটের মাধ্যমে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। কাউন্সিলে ডেলিগেটদের ভোটে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সাড়ে ৬ বছর পর আবারও কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চাইছে হাইকমান্ড। প্রেস রিলিজের পরিবর্তে ভোটের মাধ্যমে কমিটি গঠন ইতিবাচক হবে বলে মতপ্রকাশ করেছেন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
অনেকের মতে, ছাত্রদলের কাউন্সিল হলে সংগঠনের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। এতে রাজপথে পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
গত বছর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করা হয়।
শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় এগিয়ে যারা
সংগঠন সূত্রমতে, নতুন কমিটিতে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১১-১২ সেশনের নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা বেশি। সভাপতি পদে আলোচনায় আছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুবারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল, সহসভাপতি মো. মনজুরুল আলম রিয়াদ, সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, সালেহ মো. আদনান, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। এ ছাড়া সিনিয়র হিসেবে জহির রায়হান আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম আলোচনা আছেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আটটি মামলার আসামি এবং তিনবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছেন ইজাজুল কবির রুয়েল। তিনি রাজপথের সক্রিয়, ত্যাগী এবং নির্যাতিত ছাত্রনেতা হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর তার নেতৃত্বে রাজধানীতে ৪০টির বেশি মিছিল হয়েছে বলে জানান রুয়েল। মনজুরুল আলম রিয়াদ আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং অমর একুশে হলের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই মামলায় তিনি ৬ মাসের বেশি সময় কারাবরণ করেছেন। আলোচনায় থাকায় খোরসেদ আলম সোহেল সাতটি মামলায় দীর্ঘদিন কারাবরণ করেছেন। একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সাংগঠনিক সম্পাদক আমানের বিরুদ্ধে ৭৬টি মামলা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পুলিশ হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়। দুই দফায় ১৯ দিনের রিমান্ড ও ৬ মাসের বেশি সময় কারাভোগ করেছেন আমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী হয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তার নামে ১৭টি মামলা হয়েছে। তিনি চার দফায় ৬ মাসের মতো কারাভোগ করেছেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের হামলা-মামলার মধ্যে তার সাহসী ভূমিকা সবার নজর কেড়েছিল।
এদিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পল্টন থানায় একটি মামলায় আসামি করা হয় সালেহ আদনানকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাইরের কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু।
এদের মধ্যে ডা. আউয়াল আন্দোলন-সংগ্রামে আহতদের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে তিনি এফসিপিএস অধ্যয়ন করছেন। কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাংগঠনিক দক্ষতায় এগিয়ে আছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা হয় এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুটি মামলায় বাসেত সাজাও ভোগ করেছেন এবং কয়েকটি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালে অবরোধের সময় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে তাকে পুলিশ ফেলে দেয়। ওই ঘটনায় তিনি ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মজুমদার শিমুল। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা দেয় আওয়ামী লীগ। অনলাইনে বিএনপি ও ছাত্রদলের পক্ষে লেখালেখির জন্যও তিনি নির্যাতিত ছাত্রনেতাদের কাছে জনপ্রিয়।
সাধারণ সম্পাদক পদে এগিয়ে যারা
নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, মমিনুল ইসলাম জিসান, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ, ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, সোহেল রানা, ইব্রাহিম খলিল, মাসুদুর রহমান, বায়েজিদ হোসেন। এদের মধ্যে ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। তিনি চারবার হামলার শিকার হয়েছেন। তৃণমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আছে তার। বর্তমানে খলিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা (এমফিল) করছেন।
ঢাবিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের অবসান চান অনেকেই
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত পাঁচটি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ করে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। নেতা-কর্মীরা বলছেন, ঢাবির বাইরে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের সময় তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না।
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল বলেন, ‘ঢাবিকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে অন্যদের উপেক্ষা করা হলে বিষয়টি আর ন্যায়সংগত থাকে না। নেতৃত্বের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির জন্য শীর্ষ পাঁচ পদের মধ্যে অন্তত দুই থেকে তিনটি পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
মনোয়ারুল হক/
