পালপাড়া পোড়ানো সেই সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার

Bogra Morshedসিনিয়র রিপোর্টার, এবিসি নিউজ বিডি, বগুড়াঃ এক দশক ধরে জুলুম চালানোর পর অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছে বগুড়ার পালপাড়া পোড়ানো সন্ত্রাসী মোরশেদ আলম (৩৫)। আজ সোমবার ভোররাতে বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের নয়মাইল এলাকায় একটি নৈশকোচ থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ বলছে, ১৬ দিন ধরে পালিয়ে থাকা মোরশেদ আত্মসমর্পণ করতেই বগুড়ায় আসছিলেন।

বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. মোজাম্মেল হকের ভাষ্য, গতকাল রোববার পালপাড়ায় গিয়ে তিনি নির্যাতিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোরশেদের অত্যাচারের কথা শোনেন। এ সময় আড়াল থেকে নির্যাতিত লোকজনের সঙ্গে তাঁর কথা শুনছিলেন মোরশেদের বড় ভাই তারাজুল ইসলাম ও তারাজুলের শ্বশুর এমদাদুল হক। টের পেয়ে পুলিশ তাঁদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। মোরশেদের পরিচিত আরও কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালায়।

মো. মোজাম্মেল হকের দাবি, ধরপাকড় ও অভিযানে ভয় পেয়ে মোরশেদের পরিবারের সদস্যরা তাঁকে (মোরশেদ) আত্মসমর্পণ করতে বলেন। মোরশেদ আদালতে আত্মসমর্পণ করতে রাতেই নৈশকোচে বগুড়ায় রওনা দেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই নৈশকোচ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মান্নানের ভাষ্য, মোরশেদকে পালপাড়ায় সন্ত্রাসী হামলা ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

সংখ্যালঘু শতাধিক পাল পরিবার বসবাস করে পালপাড়া গ্রামে। প্রায় এক যুগ ধরে সেখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন সন্ত্রাসী মোরশেদ আলম (৩৫)। তাঁর বাড়ি পালপাড়ার পাশের আড়িয়া রহিমাবাদ গ্রামে। মোরশেদের ভয়ে ভারতে চলে গেছে ওই পাড়ার আরও কয়েকটি পরিবার। গ্রামের পুরুষেরা এখন রাত জেগে দলবেঁধে পাহারা দেন।

হত্যা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা আছে মোরশেদের বিরুদ্ধে। মাদক ব্যবসা, জবরদখল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়া, নারী নির্যাতন, বসতবাড়ি ও মৃৎশিল্পে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুরেরও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

মুখ খুলছেন নির্যাতিত লোকজন
সন্ত্রাসী মোরশেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর পালপাড়ার নির্যাতিতরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। আজ গ্রামের বিধবা নারী মায়া রানি পালের (৬০) দেওয়া ভাষ্য, চাঁদা না পেয়ে আট মাস আগে বসতবাড়ি ভেঙে তাঁকে উচ্ছেদ করেন মোরশেদ। তাঁর তথ্যমতে, বছরে এক হাজার ২০০ টাকা চুক্তিতে মোরশেদের মামা জাকারিয়ার কাছ থেকে সামান্য একটু জায়গা ভাড়া নিয়ে সেখানেই ঘর তুলে তিনি থাকতেন। উঠানে পেয়ারা, আম, কলা, বাতাবিলেবুর গাছ লাগিয়েছিলেন। কিছু দিন আগে মোরশেদ চাঁদা নিতে আসেন। তাঁকে তিনি টাকা দিতে পারবেন না বলে জানান। এতে মোরশেদ রাম দা হাতে বাড়িতে হামলা চালান। ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেন। উঠানে লাগানো গাছ কুচি কুচি করে কেটে ফেলেন। বাধা দিতে গেলে তাঁকেও দা দিয়ে মারতে আসেন। অসহায় মায়া রানি পাল বলেন, ‘সব হারিয়ে নিঃস্ব হামি। এখন অন্যের বাড়িতে রাত কাটাই।’

দই রাখার মাটির সরা ও হাঁড়ি বানান উৎপল পাল। তাঁর ভাষ্য, বগুড়া ও রাজশাহী শহরের দইয়ের দোকানে মাটির সরা-হাঁড়ি সরবরাহ করি। প্রতি মাসে হাজার হাজার হাঁড়ি চুলায় পুড়ি। মোরশেদের নজর পড়ে ব্যবসায়। প্রথমে দুই হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হতো তাকে। দিন দিন চাঁদার অঙ্ক বেড়ে গেল। দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করে বসল মোরশেদ। না দিলে হাঁড়ি ভেঙে ফেলার হুমকি দিত।

উৎপল পাল বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিলাম। দুদিন পর আবারও ১০ হাজার টাকা চাঁদা নিতে আসলেন। টাকা না পেয়ে ওই রাতেই কয়েক হাজার হাঁড়ি ভেঙে তছনছ করলেন।’ তিনি বলেন, ‘মাটির জিনিস বিক্রি করে হামাকেরে প্যাট চলে। এক একটা মাটির জিনিস হামাকেরে কাছে সন্তানের মতো। মাটির জিনিস ভাঙলে খুব কষ্ট পাই। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মোরশেদ এ পাড়ার মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছিল।’

পালপাড়া মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ পাল বলেন, ‘১২ বছর ধরে ভয়ে আতঙ্কে মোরশেদের সব অত্যাচার নির্যাতন মুখ বুজে আমরা সহ্য করেছি। এখন শুধু মোরশেদকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না, আড়ালে থাকা গডফাদারকেও ধরতে হবে। প্রয়োজনে আমরা আরও মামলা দিতে চাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ