সাইবার অপরাধ দমনে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৩ অক্টোবর): ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসার ও আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশজুড়ে সাইবার অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনলাইনে নানা ধরনের হয়রানি, প্রতারণা, হ্যাকিং এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় বিপর্যস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সামগ্রিক সমাজে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনবলের দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং স্বতন্ত্র ইউনিট গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

অপরাধের বহুমুখী ধরন ও এর নেতিবাচক প্রভাব

সাইবার অপরাধের কারণে সমাজে পারিবারিক কলহ, তীব্র মানসিক চাপ এবং সামাজিক মর্যাদাহানির ঘটনা বাড়ছে। ভুয়া আইডি খুলে ক্ষতিকর তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে বহু মানুষ সামাজিক হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি, অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং নানা লোভনীয় প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছে। ঘরে বসে খণ্ডকালীন চাকরি বা ইউটিউব ভিডিওতে লাইক দিয়ে অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে শুরুতে সামান্য বোনাস দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করিয়ে প্রতারক চক্র অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে আত্মসাৎ করছে। এছাড়া ওটিপি শেয়ারিং, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিও এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির ফাঁদে পড়ে অসংখ্য মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের অভাব, দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিঙ্কে প্রবেশ এবং ব্যক্তিগত তথ্য অতিরিক্ত পরিমাণে শেয়ার করার প্রবণতা এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম ও গ্রেফতার পরিসংখ্যান

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধ রোধে নিয়মিত নজরদারি ও জোরালো টহল পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ে দেশজুড়ে সাইবার সংক্রান্ত ১৯১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে এবং জড়িত সন্দেহে ১০১ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন বিভাগে সাইবার অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ডিএমপির রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান এবং উত্তরাসহ বিভিন্ন বিভাগে সাইবার অপরাধের অভিযোগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। ডিবি এবং সিটিটিসি বিভাগগুলো সাইবার অপরাধীদের দমনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ

সাইবার অপরাধের শেড়ড় শিকড় উৎপাটন এবং তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে সরকার প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকার পাশাপাশি বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে। অপরাধের প্রমাণ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণে ডিএমপির ডিবিতে সাইবার ল্যাব এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) নতুন ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, গত ১ অক্টোবর কেন্দ্রীয়ভাবে একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে ৪ হাজার ৫৯২ জন সদস্যের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদন্তের মান বাড়াতে পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্সের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তীতে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

সূত্র: বাসস

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ