লাতিনে রপ্তানি সম্প্রসারণে তিন মাসে আয় সাড়ে ১৯ কোটি ডলার
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২১ অক্টোবর): ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রথাগত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মেয়াদে) দক্ষিণ আমেরিকার মোট ১১টি দেশে সবমিলিয়ে ১৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে ব্রাজিল, চিলি এবং পেরু প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ও গন্তব্য হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উল্লিখিত তিন মাসে কেবল ব্রাজিলের বাজারেই ৭ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। পাশাপাশি চিলিতে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার এবং পেরুতে ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে কলম্বিয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার, উরুগুয়েতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার এবং আর্জেন্টিনায় ১ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানির সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
যদিও এই অঞ্চলের বাজারে তৈরি পোশাক খাত প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস হিসেবে টিকে রয়েছে, তথাপি পাটজাত পণ্য, চামড়ার তৈরি জিনিসপত্র, গৃহসজ্জার বৈচিত্র্যময় উপকরণ, হস্তশিল্প এবং জীবনযাপন সংক্রান্ত বিভিন্ন পণ্যের বাজার ধরার অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে ‘হোম শো ব্রাজিল ২০২৬’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। ব্রাসিলিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে এবং ইপিবির আর্থিক সহায়তায় এই মেলায় দেশের শীর্ষস্থানীয় চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। মেলায় অংশগ্রহণকারী এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল— জিহান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মাদার ট্যানারি, রেইনবো জুট এবং ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস। তারা মোট পাঁচটি পৃথক বুথের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরে।
উক্ত প্রদর্শনীতে পাট ও প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে তৈরি নানা ধরনের ব্যাগ, ঝুড়ি, চামড়াজাত বিভিন্ন দ্রব্যাদি, গৃহসজ্জার নানা উপকরণ, বাঁশের তৈরি পণ্য, টেরাকোটা, মাটির শিল্পকর্ম এবং ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া বিদেশি ক্রেতা ও আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের রপ্তানি উপযোগী সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে পরিচিত করতে ইপিবি ও দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষ প্রচারণামূলক বুথও স্থাপন করা হয়েছিল।
মেলা চলাকালীন বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ফলপ্রসূ বাণিজ্যিক আলোচনা এবং মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সম্ভাব্য ক্রেতারা বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন ও স্টলগুলো ঘুরে দেখেন এবং প্রদর্শিত পণ্যের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গৃহসজ্জা ও লাইফস্টাইল পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রাজিলের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের সক্ষমতা জোরালোভাবে তুলে ধরা।
এ বিষয়ে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে এবং উদীয়মান বৈশ্বিক বাজারগুলোতে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে ইপিবি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজমে আরও পরিকল্পিত ও পেশাদার উপায়ে অংশগ্রহণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অল্প কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের মধ্যে ব্যবসা সীমাবদ্ধ থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট বা অস্থিরতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই নতুন নতুন পণ্য ও উদীয়মান বাজার খুঁজে বের করার বিষয়টি দিন দিন অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ পরামর্শ দেন যে, যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার পূর্বে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্য বাজারের ভোক্তা চাহিদা, ক্রয়ক্ষমতা, ফ্যাশন বা পছন্দের ধরন, স্থানীয় পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়িক রীতিনীতি সম্পর্কে আগে থেকেই গভীর গবেষণা পরিচালনা করা আবশ্যক। এর ফলে মেলার সুফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি জাতীয় প্যাভিলিয়নের যথাযথ ব্র্যান্ডিং, রপ্তানিকারকদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি আরও উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি করার ওপরও জোর দেন তিনি। তার মতে, এসব পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপান্তর করতে সক্ষম।
ইপিবির পণ্যভিত্তিক খাতওয়ারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য এখনও প্রধানত পোশাক খাতনির্ভর। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেবল ওভেন কাপড়ের পোশাক এবং এর আনুষঙ্গিক পণ্য রপ্তানি থেকেই প্রায় ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার আয় হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে নিট পোশাক রপ্তানি করে অর্জিত হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার।
এই দুই প্রধান রফতানি পণ্য মিলে অর্জিত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আলোচ্য দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে ওষুধ রপ্তানির মাধ্যমে প্রায় ৬৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার এবং জুতা ও সমজাতীয় চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, চামড়ার সামগ্রী এবং ভ্রমণসামগ্রীও রপ্তানি তালিকার অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। এসব সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনার চমৎকার সুযোগ বিদ্যমান।
রপ্তানির সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ব্রাজিল ও চিলি একত্রে বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ জুগিয়েছে। এই দুটি দেশে রপ্তানির মোট পরিমাণ পৌঁছেছে ১২ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বাজার সম্প্রসারণের কৌশলগত পরিকল্পনায় ব্রাজিল ও চিলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে পেরু ও কলম্বিয়ার সাথেও ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও নিবিড় করে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সূত্র: বাসস
মনোয়ারুল হক/
