জ্বালানি আমদানিতে খরচ বাড়তি হবে: ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩১ মার্চ) : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজি গ্যাস আমদানিতে বাড়তি খরচ হবে, যা বাজেটের আগেই সমন্বয় করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, এতে লেনদেন ভারসাম্যে বড় ধরনের চাপ পড়বে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর সিপিডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক বাজেট মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, সরকার বলেছে পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো এক দেশের মুখাপেক্ষী থাকা হবে না। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির কারণে যেন অন্য কোনো দেশ থেকে তেল ও জ্বালানি আমদানিতে যেন কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যদিও জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তির ভাষায় সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এমন আইনি অনিশ্চয়তা সেখানে আছে, যার ফলে রাশিয়ার মতো দেশ থেকে তুলনামূলক সস্তা তেল আমদানি করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ছাড় নেওয়া পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত কেবল বাজারদর বা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না; বরং তা ক্রমেই ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামোর ভেতরেও বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ‘ফুড, ফুয়েল ও ফার্টিলাইজার’ অর্থাৎ খাদ্য, জ্বালানি ও সারের ওপর। এই তিন ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণে আমদানি করতে হয়। ফলে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।
বাজেট নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এবারের বাজেট যেন গতানুগতিক না হয়, সেজন্য প্রকল্প যাচাই বাছাই করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে এমন অনেক প্রকল্প আছে, যেগুলো ১০ বছর ধরে চলছে। এসব প্রকল্প টিকিয়ে রাখার জন্য দেখা যায়, প্রতি বছর কিছু অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে ‘সুইটহার্ট ডিল’ বলা হয়। যেসব প্রকল্প এভাবে বছরের পর বছর ধরে চলছে, সেগুলোকে ‘জম্বি প্রকল্প’ বলা হয় বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, এর মাহাত্ম্য হলো- এসব প্রকল্প শেষ করতে চাইলেও শেষ করা যায় না। অর্থাৎ মারতে চাইলেও মারা যায় না।
সরকারি ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাহিদা বাড়বে। তাই ভর্তুকির মধ্যে অদক্ষ ও অন্যায্য খাতগুলো চিহ্নিত করে তা পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। পাশাপাশি ধাপে ধাপে নগদ প্রণোদনা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি।
বাজেটে বিপুল পরিমাণে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই ভর্তুকি কে পাচ্ছে, তা নিশ্চিত করা দরকার বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তার একাংশ কৃষকেরা পাচ্ছেন ঠিক। তবে সব ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী নির্ধারণ ঠিক হয় না। আসন্ন বাজেটে অর্থসংস্থান বাড়াতে কর ছাড় কমানো, করের আওতা বৃদ্ধি এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান এই অর্থনীতিবিদ।
বর্তমান বিএনপি সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারে বাজেটে বিভিন্ন ধরনের ছাড় তুলে নেওয়ার কথা বলেছে। সেই সঙ্গে তারা সম্পদে করারোপ করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কথা বলেছে। এসব অঙ্গীকার তারা যেন বাস্তবায়ন করে, সে জন্য সংবাদমাধ্যমকে সচেতনভাবে নজরদারি করতে হবে বলে পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘হেয়ারকাট’ নীতির সমালোচনা করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ প্রাপ্য সুদ এভাবে কাটছাঁট করা হলে রাঘব বোয়ালদের ওপর আরও বেশি খড়গহস্ত হতে হবে।
তিনি বলেন, সাধারণ আমানতকারীদের চুল কেটে দেওয়া হলে অনেকের মাথা ন্যাড়া করে দিতে হবে।
বাজেট প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমলাদের কারণে গতানুগতিক বাজেট থেকে বেরোতে পারেনি। এখন নির্বাচিত সরকার তা পারে কি না, সেটা দেখার বিষয়।
এ ছাড়া তিনি রাজস্ব আয়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা না দেওয়ার পক্ষে কথা বলেন।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে করের আওতা বাড়িয়ে করহার কমাতে হবে। সেই সঙ্গে শুধু আয়ের উপর করারোপ করলেই হবে না, সম্পদের উপরও কর আরোপ করতে হবে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।
তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম বছরে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে শেষ বছরে তা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিগত সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে পে-স্কেল সংক্রান্ত যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই সরকারের নিজের মতো কমিশন গঠন করে এটাকে বিবেচনা করা উচিত। যেখানে আগের সরকারের পে-কমিশনের রিপোর্টটি একটা উপাদান হিসাবে বিবেচনা করতে পারে। প্রশ্নহীনভাবে এটাকে বিবেচনা করার সুযোগ উনাদের নেই, বলেন দেবপ্রিয়।
