প্রথম কার্যদিবসেই সংবিধান সংস্কার ও গণভোট ইস্যুতে উত্তপ্ত জাতীয় সংসদ

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩০ মার্চ) : ১৩ দিন বিরতির পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন পুনরায় শুরু হলেও প্রথম কার্যদিবসেই সংবিধান সংস্কার ও গণভোট বাস্তবায়ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাকবিনিময়, পয়েন্ট অব অর্ডারে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং একাধিকবার সভাপতির হস্তক্ষেপে অধিবেশনের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

রবিবার (২৯ মার্চ) অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই নির্ধারিত আসনে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। কার্যসূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও বিরোধী দল তা স্থগিত রেখে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি তোলে।

বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে নোটিশ উত্থাপন করে তাৎক্ষণিক আলোচনার আহ্বান জানান। তার যুক্তি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে—সেই রায় বাস্তবায়নই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও একই সুরে এটিকে ‘সর্বোচ্চ জনগুরুত্বপূর্ণ’ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন।

অন্যদিকে সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি মেনে চলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব ও অন্যান্য নোটিশের আলোচনা শেষ না করে নতুন ইস্যুতে অগ্রসর হওয়া সংসদীয় রীতির পরিপন্থি এবং এতে সাধারণ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এ অবস্থানকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চরমে ওঠে।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে বিরোধী সদস্যরা আপত্তি জানান। এতে হট্টগোল সৃষ্টি হলে ডেপুটি স্পিকার বারবার হস্তক্ষেপ করে সংসদে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেন। তিনি শেষ পর্যন্ত আশ্বাস দেন, নির্ধারিত কার্যক্রম শেষে বিরোধী দলের নোটিশ বিবেচনা করা হবে।

সংসদের ভেতরের উত্তাপের পাশাপাশি বাইরে ও সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণভোট অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টিতে ঐকমত্য হলেও গণভোটসহ প্রায় ২০টি বিষয়ে এখনো মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ কমিটি এ নিয়ে পুনরায় বৈঠক করেছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা গেছে। একাংশের মতে, গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া স্পষ্ট নয় এবং এটি সংসদের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অন্যরা মনে করেন, জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং এ প্রক্রিয়াকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।

এদিকে সংবিধান অনুযায়ী, অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। সেই হিসেবে আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা রাজনৈতিক চাপ ও উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অধিবেশন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন এবং অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা। এসব বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানগত দূরত্ব স্পষ্ট, যা আগামী দিনগুলোতে সংসদের কার্যক্রমকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। দুই কার্যদিবস শেষে ১৫ মার্চ তা মুলতবি করে ২৯ মার্চ পুনরায় বসা হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা ৫০ ঘণ্টা চলবে এবং চলতি অধিবেশন আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ