প্রতিবছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারের বেশি পাচার

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩০ মার্চ) : আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে গত ১০ বছরে (২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার (৬৮.৩ বিলিয়ন) অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) এর পরিমাণ ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারের বেশি পাচার হয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশ থেকে অর্থ পাচারের এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের মূল্য বা পরিমাণের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরানো হয়েছে। মূলত কর ফাঁকি দেওয়া, মুনাফা স্থানান্তর বা বিদেশে পুঁজি পাচারের উদ্দেশ্যে আমদানিতে অতিরিক্ত মূল্য (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে কম মূল্য (আন্ডার ইনভয়েসিং) দেখানোর এই কারসাজি করা হয়।

জিএফআইয়ের তথ্যমতে, অর্থ পাচারে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অর্থ পাচারের দিক থেকে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের এই অবৈধ অর্থপ্রবাহের একটি বড় অংশ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের সময় ঘটেছে। মোট ঘাটতির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বা ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কারসাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই ঝুঁকি কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত ও আমদানিনির্ভর শিল্পগুলোতে এই ধরনের অর্থ পাচারের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এই ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও ভারতের তুলনায় তা অনেক কম। একই সময়ে ভারত থেকে বাণিজ্যের আড়ালে রেকর্ড ১ লাখ ৬ হাজার কোটি (১.০৬ ট্রিলিয়ন) ডলার পাচার হয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি লক্ষ করা গেছে।

পুরো এশিয়া অঞ্চলের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল ২০২২ সালেই এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে বাণিজ্যের আড়ালে পাচার হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি ডলার। চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতিগুলো এই তালিকায় শীর্ষে থাকলেও ছোট-বড় সব দেশেই এই সমস্যা প্রকট আকারে বিদ্যমান। এক দশকে চীনে ৬ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডে ১ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন ও ভারতে ১ দশমিক শূন্য ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। মোট বাণিজ্যের বার্ষিক হিসাবে চীনের প্রায় ২৫ শতাংশ ও ভারতের প্রায় ২২ শতাংশ অর্থ এভাবে পাচার হয়।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এশীয় অর্থনীতিগুলোতে এ ধরনের অনৈতিক চর্চা গভীরভাবে জেঁকে বসেছে। গত এক দশকে এই প্রবণতা হ্রাসের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়। পাচার ঠেকাতে শুল্ক ব্যবস্থাপনা জোরদার, আঞ্চলিক চুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে জিএফআই প্রতিবেদনে।

এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি নিয়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। ওই সময়ের বাজারদরে (প্রতি ডলারের দাম ১২০ টাকা) এর পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি খবরের কাগজকে বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে বাণিজ্যের আড়ালে প্রতিবছরই দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। মূলত পাচারকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কোনো শান্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় দিনে দিনে এই প্রবণতা বাড়ছে। তাই সরকার অর্থ পাচার ঠেকাতে না পারলেও কমাতে হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের যদি আইনের আওতায় না আনা যায়, তাহলে কিন্তু এটা বাড়বেই। কেননা এর মাধ্যমে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। যেভাবেই হোক, এ ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে আরও উন্নত ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে অর্থ পাচার করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশে যথাযথভাবে আইনের শাসন কায়েম করতে হবে। পাচারের সঙ্গে জড়িতদের যদি আইনের আওতায় আনা না যায়, তবে পাচার কমার পরিবর্তে অন্যরা এই কাজে আরও উৎসাহিত হবে। যারা অর্থ পাচার বা ব্যাংক খাতের লুটপাটের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ