সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিস রোগের কারণ লক্ষণ ও চিকিৎসা
স্বাস্থ্য ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৩ মার্চ) : সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিস বা ঘাড়ের জয়েন্টের বাত একটি বয়সজনিত সমস্যা, যা সাধারণত বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। ঘাড়ের হাড়, ডিস্ক ও জয়েন্টে ধীরে ধীরে অবক্ষয়জনিত পরিবর্তন ঘটার ফলে এ রোগের সৃষ্টি হয়। তবে শুধু বয়সই নয়, জীবনযাত্রা, পেশাগত অভ্যাস, আঘাত কিংবা কিছু শারীরিক রোগের কারণেও সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিস হতে পারে। দীর্ঘ সময় একইভাবে ঘাড় বাঁকিয়ে কাজ করলে ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে ডিস্কের গঠনগত পরিবর্তন হয়ে এই রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ডিস্কের আর্দ্রতা কমে গেলে দুই কশেরুকার মাঝে ঘর্ষণ বৃদ্ধি পায় এবং সেখানে নতুন হাড়ের বৃদ্ধি ঘটে, যাকে স্পার বলা হয়। এই স্পার সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বংশগত কারণেও কম বয়সে এই রোগ দেখা দিতে পারে। এছাড়া যেসব পেশায় দীর্ঘ সময় ঘাড় একই অবস্থায় রাখতে হয় বা বারবার ঘাড় নাড়াতে হয়, যেমন- দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা ল্যাপটপে কাজ করা- তাদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অনেক সময় পূর্ববর্তী ঘাড়ের আঘাত থেকেও সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিসের সৃষ্টি হতে পারে। আবার ঘুমানোর সময় অতিরিক্ত শক্ত বা অতিরিক্ত নরম বালিশ ব্যবহারের অভ্যাস থেকেও ঘাড়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিছু সিস্টেমিক রোগ, যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা অটোইমিউন আর্থ্রাইটিসের কারণেও সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিস হতে পারে।
এ রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘাড়ে ব্যথা এবং ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া। অনেক সময় এই ব্যথা পিঠের মাংসপেশীতে ছড়িয়ে পড়ে। আবার ঘাড়ের ব্যথা হাত পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হাত অবশ হয়ে যাওয়া বা ঝিমঝিম করার অনুভূতি দেখা যায়, যাকে সার্ভিকাল রেডিকুলোপ্যাথি বলা হয়। এছাড়া মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা এবং বমি বমি ভাবও হতে পারে। রোগ নির্ণয়ে প্রথমে রোগীর কাছ থেকে বিস্তারিতভাবে রোগের ইতিহাস নেওয়া হয় এবং কিছু নির্দিষ্ট ক্লিনিকাল পরীক্ষা করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন রেডিওলজিকাল পরীক্ষা করা হয়, যেমন এক্স-রে সার্ভিকাল স্পাইন (দুই ভিউ), ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (MRI), সিটি স্ক্যান এবং ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি (EMG)।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলোথ রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া। এরপর কাউন্সেলিং। ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসায় সাধারণত ব্যথানাশক ওষুধ, যেমন- NSAID দেওয়া হয়। মাংসপেশীর শক্তভাব কমানোর জন্য মাংসপেশী শিথিলকারী (Muscle Relaxant) ব্যবহার করা হয়। স্নায়ুর ক্ষতি পূরণে সহায়তার জন্য ভিটামিন বি১, বি৬ ও বি১২ দেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা নিয়ন্ত্রণে কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তীব্র ব্যথা ও প্রদাহের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য কর্টিকোস্টেরয়েড দেওয়া হতে পারে।
সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিসের চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে রোগীকে ঘাড় ও আশপাশের মাংসপেশীর কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়াম নিয়মিত করানো হয়, যা হাড় ও মাংসপেশীর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া ইলেক্ট্রোথেরাপির মাধ্যমে ঘাড়, পিঠ ও হাতে তাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলে মাংসপেশিতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং ব্যথা কমে যায়। সার্ভিকাল ট্র্যাকশনের মাধ্যমে ঘাড়ের স্নায়ুর ওপর হাড় বা স্পারের কারণে যে চাপ তৈরি হয় তা কমানো সম্ভব। ফলে হাতের অবশ ভাব বা ঝিনঝিন অনুভূতিও অনেকটা কমে আসে
লেখক : ডা. দিলীর জামাল, সহকারী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন
চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা
হটলাইন : ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯
