সংসদে জায়গা পেল না টানা তিনবারের বিরোধী দল
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, ১৪ ফেব্রুয়ারি: টানা তিনটি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জাতীয় পার্টি (জাপা) এবারের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল। প্রথমবারের মতো দলটির কোনো প্রার্থী সংসদে জয়ী হতে পারেননি। এমনকি জাপার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের একটিতেও তারা জয় পায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলটির তিন দশকের প্রভাবের অবসানের ইঙ্গিত।
গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে জাপার ক্রমাগত অবনমন স্পষ্ট হয়।
২০১৪ সালে আসন: ৩৪টি
২০১৮ সালে আসন: ২২টি
২০২৪ সালে আসন: ১১টি (ইতিহাসে সর্বনিম্ন)
সর্বশেষ নির্বাচনে: ০
ভোটের হারও ধীরে ধীরে কমে প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসে। এবারের নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রার্থী দিলেও একটিতেও জয় পায়নি দলটি।
রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় অবস্থানে নেমে যান। গাইবান্ধা-১ আসনে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে পারেননি; এমনকি জামানত রক্ষার মতো ভোটও পাননি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ-এর সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতি করায় জাপা তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান হারায়। ভোটারদের চোখে তারা কার্যকর বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি।
২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর মৃত্যুর পর দলীয় কোন্দল প্রকট হয়। রওশনপন্থী ও কাদেরপন্থী বিভক্তি তৃণমূল পর্যন্ত প্রভাব ফেলে। সাংগঠনিক পুনর্গঠন না হওয়ায় ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সক্রিয়তা কমে যায়। অনেক নেতা-কর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন বা অন্য দলে যোগ দেন।
তরুণ ভোটারদের জন্য সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভিশন বা উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে না পারায় ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকও ভেঙে পড়ে।
রংপুরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, “জাতীয় পার্টির ভেতরে গণতন্ত্র ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের মানুষ এরশাদ পরিবারকে এমপি বানিয়েছেন, কিন্তু প্রত্যাশিত উন্নয়ন না হওয়ায় মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, “গত তিন সংসদে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ তকমা জাতীয় পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিরোধী দলে থেকেও সরকারের সঙ্গে অবস্থান একাত্ম হয়ে গেলে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। ক্ষমতার ভাগ থাকলেও রাজনৈতিক সত্তা ক্ষয়ে যায়—এর ফল এবারের নির্বাচনে স্পষ্ট।”
দলটির এক সাবেক ছাত্রনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জাতীয় পার্টি এখনো ব্যক্তিনির্ভর। নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ কম। তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছি।”
তরুণ ভোটারা বলেন, “নতুন প্রজন্ম নিয়ে তাদের কোনো সুস্পষ্ট অ্যাজেন্ডা নেই। তাই আমরা পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছি।”
রংপুর বিভাগে ফলাফল:
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের ফলাফল ছিল নাটকীয়—
রংপুর জেলায় ৬টির ৫টিতে জামায়াত, ১টিতে এনসিপি
গাইবান্ধায় ৫টির ৪টিতে জামায়াত, ১টিতে বিএনপি
কুড়িগ্রামে ৪টির ৩টিতে জামায়াত, ১টিতে জোট-সমর্থিত এনসিপি
নীলফামারীতে ৪টির সবকটিতে জামায়াত
পঞ্চগড়ে ২টির দুটিতেই বিএনপি
ঠাকুরগাঁওয়ের ৩টির সবকটিতে বিএনপি
দিনাজপুরের ৬টির ৫টিতে বিএনপি, ১টিতে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী)
১৯৯১ সালে রংপুরের ৩৩ আসনের মধ্যে জাপা পায় ১৭টি, ১৯৯৬ সালে ২১টি।
২০০১ সালে তা কমে ১৪টি, ২০০৮ সালে ১৩টি।
২০১৪ ও ২০১৮ সালে ৭টি করে এবং ২০২৪ সালে ৩টি আসনে জয় পায় দলটি।
এবারের নির্বাচনে শূন্য—যা দলটির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, টানা তিনবার বিরোধী দলে থাকার পর সংসদে প্রতিনিধিত্ব হারানো জাপার জন্য বড় ধাক্কা। দলটি ঘুরে দাঁড়াতে চাইলে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক রূপরেখা গ্রহণ অপরিহার্য।
মনোয়ারুল হক/
